• ঢাকা
  • সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৪ আশ্বিন ১৪২৮
abc constructions

শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ভীতি নিয়ে কিছু কথা


মাসুম বিল্লাহ সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১, ০১:১৭ পিএম
শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ভীতি নিয়ে কিছু কথা

ঢাকা : পরীক্ষাভীতি যে-কোন ধরনের এবং যে-কোন বয়সের শিক্ষার্থীদের কাছে একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। কারো ক্ষেত্রে ভীতিটি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, শরীর ও মনে প্রচণ্ড অস্বস্তি বিরাজ করে। ফলে পরীক্ষায় যেসব উত্তর দিতে পারার কথা, সেগুলোও গোলমেলে হয়ে যায়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা খাওয়াদাওয়া, গোসল করা ছেড়ে দেয়। এক্ষেত্রে বাবা-মা, ভাইবোন ও শিক্ষকদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। তাদের বুঝতে হবে, খাওয়াদাওয়া করলে, ঘুম না হলে, গোসল না করলে শারীরিক এবং মানসিক ক্ষেত্রে যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয় তা তাদের পরীক্ষার জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। শরীর ও মনের মধ্যে রয়েছে গভীর সম্পর্ক। শরীর খারাপ হলে মনও খারাপ হবে। আবার মানসিক স্বস্তি না থাকলে শরীর খারাপ হতে বাধ্য। আর শরীর বা মন যে-কোনো একটি খারাপ হলে পরীক্ষা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। পরীক্ষা দেওয়া হচ্ছে শরীর, মন ও প্রস্তুতির মধ্যে এক নিবিড় বন্ধন। কাজেই পরীক্ষা ভালভাবে দিতে হলে, পরীক্ষায় ভালো করতে হলে পরীক্ষার পূর্বে শরীর ও মন অবশ্যই ভালো রাখতে হবে। পরীক্ষা ভীতির কারণে আমাদের শিক্ষার্থীরা এগুলো ছেড়ে দেয় বা অনিয়মিতভাবে করে থাকে। ফলে তাদের শরীর ও মনের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। আর তার ফলে অনেক জানা বিষয়ও তারা ভুল করে থাকে। কাজেই পরীক্ষাভীতি কীভাবে জয় করা যায় সে চেষ্টা আমাদের চালাতে হবে।

প্রথমত, নিয়মিত পাঠ শেষ করা, নিয়মিত পাঠ সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যাবলি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে পরীক্ষাভীতির  প্রধান ও মোক্ষম ঔষধ। বছরের শুরুতে এবং প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন শেষ করা হলে পরীক্ষার সময় বেশি চাপ থাকে না, ফলে ভীতি অনেকটাই কমে যায়। পড়া জমিয়ে রাখলে টেনশন বাড়ে এবং তা অসহনীয় হয়ে ওঠে পরীক্ষার পূর্বে। এ বিষয়টি শিক্ষার্থীদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে। প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন করে ফেললে পরীক্ষা নিয়ে মানসিক চাপ থাকে না, ফলে শরীর ও মন থাকে প্রফুল্ল।

নিয়মিত কাজ করার পরেও যে একেবারে টেনশনমুক্ত থাকা যাবে পরীক্ষার পূর্বে বিষয়টি এমন নয়। পরীক্ষার পূর্বে টেনশন হবেই, এটিই স্বাভাবিক। পরীক্ষার পূর্বে বিদ্যালয়ে আনন্দঘন পরিবেশে পরীক্ষার বিষয়ের ওপর শ্রুতিপাঠের আয়োজন করা যেতে পারে। জানা-অজানা কুইজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আনন্দ-হাসিতে মেতে উঠবে। পরীক্ষার পূর্বে বিদ্যালয়গুলো এ ধরনের কর্মকাণ্ডের আয়োজন করলে শিক্ষার্থী তথা পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যাবে। নতুনভাবে তারা উজ্জীবিত হবে। অভিভাবকদের সাথে সভা করে তাদের মতবিনিময় করা যেতে পারে, যাতে তারা  পরীক্ষার্থীদের খাবা, নিয়মিত কাজগুলো ঠিকমতো করার তাগিদ দেন ও ব্যবস্থা করেন। বাসায় টিভির অনুষ্ঠানগুলো লাগামহীনভাবে না দেখে বরং তারা তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গ দেবেন।

পরীক্ষার সময় ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোন প্রশ্নের উত্তর কখন দিতে হবে, কত সময়ের মধ্যে দিতে হবে—তার রিহের্সাল এবং  মক টেস্ট আগে দিলে মূল পরীক্ষার ভীতি কমে যাবে। কারণ শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে তাদের কোন প্রশ্নে কত সময় লাগবে। সময় তাদের হাতে, তারা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে পরীক্ষার পুরো সময়। তাই পরীক্ষার পূর্বে শ্রেণিকক্ষে  কিছু মক টেস্টের আয়োজন করা যেতে পারে। আমাদের বিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারগুলো অবশ্য অনেক পরীক্ষার আয়োজন করে থাকে মূল পরীক্ষার পূর্বে। এই পরীক্ষাগুলো অবশ্য শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার স্বাদকে তেতো করে ফেলে। এসব পরীক্ষা দিতে দিতে শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাদের শরীর ও মন পরীক্ষার পূর্বেই বিষিয়ে ওঠে। এ ব্যাপারটি আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

পুরোনো পরীক্ষা পদ্ধতি সমর্থন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী একটা বিষয় পড়ার পর সে কী শিখল তা যাচাই করার জন্য একটি ভালো পদ্ধতি হলো তাকে কিছু লিখতে বলা। এখন তারা যা শিখছে এবং যে পদ্ধতিতে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে তাতে আমরা ফলাফলের ঊর্ধ্বগতি বা ফল বিস্ফোরণ দেখছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, ফলাফলের এ বিস্ফোরণের সাথে মানের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ বলেন, ‘সৃজনশীল নামটাই শুধু আকর্ষণীয়। শিক্ষার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক যে বিপর্যয় এবং মনের ক্ষেত্রে যে ধস নেমেছে তার পেছনে এটি অন্যতম কারণ। যা ইচ্ছে তাই লিখলেই সৃজনশীল বলে নম্বর দিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার নামে যেসব প্রশ্ন করা হয় তা বিভ্রান্তিকর এবং বিদঘুটে। এসব বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাভীতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। অধিকাংশ  শিক্ষক নোট গাইড ব্যবহার করছেন অথচ শিক্ষার্থীদের তা ব্যবহার করতে নিষেধ করছেন। এই দ্বিমুখিতাও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাভীতি বাড়াচ্ছে।’

এ কথা সত্য, পরীক্ষাভীতি এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা যা অনেকের মধ্যেই মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগের সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাকে অনেক কঠিন একটি প্রক্রিয়া মনে করে ভয় পায়, যার প্রভাব পড়ে পরীক্ষা চলার সময়। পরীক্ষাকে যারা ভয় পায়, পরীক্ষা শুরুর আগে থেকে সাধারণত তাদের মনের মধ্যে সৃষ্টি হয় ভীষণ চাপ। পরীক্ষার প্রধান ভার বইতে হয় মগজকে, ফলে আরো কিছু উপসর্গের সৃষ্টি হয়। কাজেই পরীক্ষাকে অহেতুক ভীতি না ভেবে স্বাভাবিক অবস্থা ভাবাই ভালো এবং সেভাবেই তার মোকাবিলা করতে হবে।

কিন্তু আমাদের দেশে বিভিন্ন পরীক্ষার সিলেবাস থাকে দীর্ঘমেয়াদি। পরীক্ষার আগে সিলেবাস শেষ না হওয়ার ফলে শুরু হয় পরীক্ষাভীতি। অনেক ছাত্রছাত্রী বিষয় নির্বাচনে ভুল করে। বিষয় কঠিন মনে হয়। এর ফলে চাপ সহ্য করতে না পেরে পরীক্ষাকে ভয় পেতে শুরু করে। পরীক্ষার আগে ভালো প্রস্তুতি না নিতে পারলেও পরীক্ষাভীতি জন্ম নেয়। কাজেই পরীক্ষা বিষয়টাকে সহজ-স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। নিজের আশা কমাতে হবে। মূলত অতিরিক্ত আশা করার কারণে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। আশা কমলে চাপও কমবে, এতে পরীক্ষা ভীতিও কমে যাবে। পরীক্ষাভীতি কাটানোর ভালো উপায় হলো আগে থেকে নিয়মমাফিক পড়া। যদি বছরের শুরু থেকেই একটি নির্দিষ্ট নিয়ম করে রুটিনমাফিক পড়ালেখা করা যায় তাহলে  পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা ভীতি থাকে না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিংবা সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত পড়ালেখার প্রয়োজন নেই। পড়ালেখার জন্য দৈনিক ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় যথেষ্ট। এ সময়টুকু একটানা পড়তে হবে এমন কথা নেই। সময় ভাগ করে রুটিনমাফিক পড়লে  ভালো হবে। আবার এও তো সত্য যে, সৃজনশীলতার নতুন চমক সৃষ্টি করেছে সবার মধ্যে এক নতুন উদ্বেগ।

এরও কারণ হচ্ছে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠ পরিচালনা করলেও যথোপযুক্ত সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নে দক্ষ নন। যার ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে গতানুগতিক ধারায় পাঠ গ্রহণ করে এবং পরীক্ষার হলে সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দিতে ভুল করে। শুধু কি গাইড বই এবং কোচিং দিয়ে সৃজনশীল মেধা তৈরি করা সম্ভব? সৃজনশীল বা কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নের চারটি অংশ—জ্ঞানমূলক, অনুধাবনমূলক, প্রয়োগমূলক ও উচ্চতর দক্ষতামূলক। শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই পড়ে জ্ঞানমূলক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, আর বাকি তিনটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় চিন্তাশক্তি ও সৃজনী মেধার। ঠিকভাবে সৃজনশীল প্রশ্ন না বুঝে পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে বলে মানসম্পন্ন শিক্ষার্থী গড়ে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে। ভালো ফলাফল আর সুদক্ষ জ্ঞানী তৈরি করা এক নয়।

যদিও বর্তমান সময়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তা কতটুকু ফলপ্রসূ তা দেখার বিষয়। আমাদের পাঠ্যপুস্তক যদি হয় গতানুগতিক ধারায় আর প্রশ্নপত্র হয় সৃজনশীল ধারায় তাহলে তা কতটুকু কার্যকর হবে? অবশ্য বর্তমানে এই সীমাবদ্ধতা অনেকখানি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। এখন সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থাকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা উপকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার থাকা আবশ্যক। শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ শিক্ষক দ্বারা এই পদ্ধতির অগ্রগতি সম্ভব হবে না, যদি না সঠিক শিক্ষা উপকরণ থাকে। শিক্ষকদের থাকতে হবে শিক্ষণ পদ্ধতির জ্ঞান, পরিমাপ ও মূল্যায়নের জ্ঞান, প্রশ্ন প্রণয়ন এবং সৃজনী মেধা। যদি শিক্ষকদের পাঠ পরিচালনায় সৃজন মেধার ত্রুটি থাকে তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীল শিক্ষায় ভীতি থাকবে।

সৃজনশীলতা মানে শিক্ষার্থীদের হুবহু কিছু মুখস্থ করতে হবে না, নিজেদের বুদ্ধি খাঁটিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিবে যা ছিল আনন্দের বিষয়। তার পরিবর্তে এখন বেড়ে গেছে  শিক্ষার্থীসহ অভিভাবক ও শিক্ষকদের টেনশন। সৃজনশীলের আওতা যতই বাড়ছে ততই বাড়ছে নোট-গাইড ও কোচিং নির্ভরতা। আর তা শিক্ষার্থীদের আনন্দ দেওয়ার পরিবর্তে বাড়িয়ে দিয়েছে ভয়, মনে সৃষ্টি করছে সন্দেহ এবং এ সবই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাভীতি দিনকে দিন বাড়িয়ে তুলছে। এ থেকে তাদের মুক্তি দিতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিষয়ক গবেষক
[email protected]

 

Haque Milk Chocolate Digestive Biscuit
Dutch Bangla Bank Agent Banking

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।

Wordbridge School
Sonali IT Pharmacy Managment System