ফাইল ছবি
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে তৈরি পোশাক খাতের নাম। কিন্তু শুধু একটি খাতের ওপর ভর করে দীর্ঘদিন অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া যায় না। তাই এখন সময় এসেছে নতুন রপ্তানি খাতের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার। সেই সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য-বিশেষ করে ফুটওয়্যার-বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ হয়ে সামনে এসেছে।
বাংলাদেশে চামড়ার অভাব নেই। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া উৎপাদন হয়, আছে সস্তা ও দক্ষ শ্রমশক্তি। তবু এই খাত থেকে আমরা আশানুরূপ সুফল পাইনি। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা না থাকায় সম্ভাবনাময় এই শিল্প অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তনের কারণে চামড়াজাত পণ্য, বিশেষ করে জুতার বাজারে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের বড় ক্রেতারা এখন চীন ও ভারতের বাইরে বিকল্প দেশ খুঁজছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং নানা বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে তারা নতুন উৎসের দিকে ঝুঁকছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সহজেই একটি গ্রহণযোগ্য উৎপাদন কেন্দ্র হতে পারে। বিশেষ করে ফুটওয়্যার খাতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে ভালো আয় করার সুযোগ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য-বিশেষ করে ফুটওয়্যার-শুধু আরেকটি রপ্তানি খাত নয়, বরং তৈরি পোশাক নির্ভরতা কমানোর একটি বাস্তব সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কিন্তু কষ্টের বিষয় হলো-বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য একটি পুরোনো কিন্তু অবহেলিত সম্ভাবনার নাম। একসময় এই খাত ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি আয়কারী শিল্প, কিন্তু নীতিগত দুর্বলতা, পরিবেশগত জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এটি প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বর্তমান বাস্তবতায় এই খাত নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে চামড়াজাত পণ্যের মধ্যে ফুটওয়্যার এমন একটি উপখাত, যেখানে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে উচ্চ মূল্য সংযোজন সম্ভব।
বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার সহজ প্রাপ্যতা, শ্রমঘন উৎপাদনে দক্ষ জনবল এবং প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ব্যয় ফুটওয়্যার শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে এগিয়ে নেওয়ার বাস্তব ভিত্তি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের পুনর্বিন্যাস, চীন ও ভারতের বাইরে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খোঁজার প্রবণতা এবং শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য—বিশেষ করে ফুটওয়্যার—শুধু একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত নয়, বরং তৈরি পোশাক নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি কার্যকর পথ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য—বিশেষ করে ফুটওয়্যার—বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সম্ভাবনার খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের ভিত্তি শক্ত। কাঁচা চামড়ার সহজ প্রাপ্যতা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এই খাতকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেয়। তবু বাস্তবতা হলো, এই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। বর্তমানে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় নগণ্য।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৮ শতাংশই আসে এই দেশ থেকে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ফুটওয়্যার বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি ফুটওয়্যার রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৭২ মিলিয়ন ডলার, যেখানে দেশটির মোট ফুটওয়্যার আমদানি বহু বিলিয়ন ডলারের বাজার। অর্থাৎ, চাহিদার দিক থেকে বাজার উন্মুক্ত থাকলেও আমরা এখনো সেখানে কার্যকর অবস্থান তৈরি করতে পারিনি।
তবে আশার দিকও স্পষ্ট। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ফুটওয়্যার রপ্তানি প্রায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে সঠিক নীতি ও বাজার পরিস্থিতি থাকলে বাংলাদেশ দ্রুত অগ্রগতি করতে পারে। এর পেছনে বড় একটি কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কাঠামোতে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা। চীন ও ভারতের মতো প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর ওপর যেখানে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের ওপর শুল্কহার তুলনামূলক কম। ফলে মার্কিন আমদানিকারক ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশকে নতুন করে বিবেচনা করছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের সাম্প্রতিক পরিবর্তনও বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ চেইনের ভঙ্গুরতা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক মার্কিন ক্রেতা এখন ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ বা ‘ডাইভার্সিফায়েড সোর্সিং’ কৌশল অনুসরণ করছে। তারা চীন বা ভারতের বাইরে নির্ভরযোগ্য, কম খরচের এবং স্থিতিশীল উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য হতে পারে—যদি আমরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারি।
কিন্তু এই সম্ভাবনার পথে বেশ কিছু কাঠামোগত বাধা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, অবকাঠামো সংকট। অনেক শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিয়মিত সরবরাহ উৎপাদন ব্যাহত করে। দুর্বল সড়ক যোগাযোগ, বন্দর জট এবং অদক্ষ লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা সময় ও খরচ দুটোই বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে এটি বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
দ্বিতীয়ত, পরিবেশগত মান ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনের ঘাটতি। বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো এখন পরিবেশ সংরক্ষণ, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং শ্রমিক কল্যাণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (LWG)-এর মতো আন্তর্জাতিক সনদ না থাকায় অনেক বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান বড় ব্র্যান্ডের সরাসরি অর্ডার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং বাজারে প্রবেশের শর্ত।
তৃতীয়ত, কাস্টমস ও ডেলিভারি ব্যবস্থার জটিলতা। বন্দরে দীর্ঘসূত্রতা, কাগজপত্রের জটিল প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব সময়মতো পণ্য রপ্তানিকে অনিশ্চিত করে তোলে। আন্তর্জাতিক বাজারে সময়ানুবর্তিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। এতে ব্যর্থ হলে দীর্ঘমেয়াদে বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানোন্নয়ন ও ব্র্যান্ডিংয়ের সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ এখনো মূলত কম দামের পণ্য সরবরাহকারী হিসেবেই পরিচিত। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ফুটওয়্যার বাজারে প্রকৃত মুনাফা আসে উচ্চমূল্যের, নকশাভিত্তিক ও ব্র্যান্ডেড পণ্য থেকে। নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি ও ভ্যালু অ্যাডেড উৎপাদনে পিছিয়ে থাকায় আমরা সেই বাজার ধরতে পারছি না।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের ফুটওয়্যার বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সমন্বিত ও দূরদর্শী নীতি উদ্যোগ প্রয়োজন। শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জনে সরকারি সহায়তা, প্রণোদনা এবং সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
পাশাপাশি নতুন ডিজাইন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইনার তৈরি, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা এবং শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা জোরদার না করলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে। এই খাত দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে অনস্বীকার্য ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে একটি মাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, শুল্কনীতি পরিবর্তন বা ভূরাজনৈতিক সংকটের মতো কোনো ধাক্কা এলে পুরো রপ্তানি আয়ই হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশকে আজ অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার ‘উদীয়মান টাইগার’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। গত এক দশকে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং রপ্তানি আয়ের বিস্তার এই পরিচয়কে জোরালো করেছে। বিশেষ করে কোভিড–পরবর্তী বৈশ্বিক মন্দার মাঝেও বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় আন্তর্জাতিক মহলেও দেশটির সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। তবে এই সাফল্যের আড়ালে একটি মৌলিক দুর্বলতা রয়ে গেছে-অর্থনীতির অতিরিক্ত একক খাতনির্ভরতা।
সবশেষে বলা যায়, সময়োপযোগী ও স্থিতিশীল সরকারি নীতিই পারে এই খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে। রপ্তানি প্রণোদনা, সহজ কাস্টমস প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিং ও সক্রিয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিশ্চিত করা গেলে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটওয়্যার বাজারে বাংলাদেশ শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, বরং একটি শক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
লেখক:
সাংবাদিক
স্থায়ী সদস্য, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, [email protected]
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।
-6a397791a3645-20260622190839.jpg)
-6a3972f5e4bb5-20260622180647.jpg)





































