• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

সুস্থতার সময়কে নেক কাজে লাগাবেন যেভাবে


ধর্মচিন্তা ডেস্ক অক্টোবর ৮, ২০২৬, ১০:১৯ এএম
সুস্থতার সময়কে নেক কাজে লাগাবেন যেভাবে

সুস্থতা এমন এক নিয়ামত, যার প্রকৃত মূল্য অনেক সময় মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর উপলব্ধি করে। শরীর যখন স্বাভাবিকভাবে কাজ করে, তখন হাঁটা, খাওয়া, নামাজে দাঁড়ানো কিংবা নিজের দৈনন্দিন কাজ নিজে করার বিষয়গুলো খুব স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। কিন্তু অসুস্থতা এসে যখন এসব কাজ কঠিন করে দেয়, তখনই বোঝা যায়—সুস্থ শরীর কত বড় একটি নিয়ামত।

একজন অসুস্থ মানুষ বিছানায় শুয়ে নামাজ আদায় করতে বাধ্য হতে পারেন, চলাফেরার জন্য অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে কিংবা স্বাভাবিক খাবার গ্রহণেও কষ্ট হতে পারে। তখন সুস্থতার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। তাই অসুস্থতার অপেক্ষা না করে সুস্থ অবস্থাতেই এই মূল্যবান সময় ও সামর্থ্যকে ভালো কাজে ব্যয় করা জরুরি।

ইসলামের দৃষ্টিতে সুস্থতা শুধু আরাম-আয়েশের বিষয় নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। এই আমানতকে ইবাদত, মানুষের সেবা, হালাল জীবিকা অর্জন এবং কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।

সুস্থতা ও অবসর—দুটি বড় নিয়ামত

মানুষের জীবনে এমন কিছু নিয়ামত রয়েছে, যেগুলোর গুরুত্ব থাকা অবস্থায় অনেকেই উপলব্ধি করতে পারে না। সুস্থতা ও অবসর তার অন্যতম। এ বিষয়ে হজরত ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)

এই হাদিস একজন মুমিনকে মনে করিয়ে দেয়, হাতে থাকা সময় ও সুস্থতা অবহেলায় নষ্ট করার সুযোগ নেই। কারণ অসুস্থতা কিংবা ব্যস্ততা কখন এসে মানুষের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা সীমিত করে দেবে, তা কেউ জানে না।

শক্তি থাকতেই কল্যাণের পথে এগিয়ে যেতে হবে

ইসলাম আত্মিক উন্নতির পাশাপাশি মানুষের কর্মক্ষমতা ও শক্তিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম ও অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।’

এরপর তিনি বলেন, ‘যা তোমার জন্য উপকারী, তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)

এখানে শক্তি বলতে কেবল শারীরিক সামর্থ্য বোঝানো হয়নি। ঈমান, জ্ঞান, ইচ্ছাশক্তি, কর্মক্ষমতা এবং নেক কাজে দৃঢ়তাও এর অন্তর্ভুক্ত। তবে শারীরিক সুস্থতা একজন মুমিনকে বহু ভালো কাজ করার বাস্তব সুযোগ তৈরি করে দেয়।

সুস্থ মানুষ মসজিদে যেতে পারেন, জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন, কোরআন তিলাওয়াত করতে পারেন, দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করতে পারেন, পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং অসহায় মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে পারেন।

যে কাজগুলোতে সুস্থতা ব্যয় করা যায়

ইবাদতে সময় ও শক্তি দেওয়া

সুস্থতার সবচেয়ে উত্তম ব্যবহারগুলোর একটি হলো আল্লাহর ইবাদতে নিজের সময় ও সামর্থ্য ব্যয় করা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করা, জামাতে অংশ নেওয়া, নফল নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে সুস্থতার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা যায়।

অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর যে ইবাদতগুলো করা কঠিন হয়ে যেতে পারে, সেগুলো সুস্থ অবস্থায় গুরুত্ব দিয়ে পালন করা উচিত।

দ্বীনি জ্ঞান অর্জন

সুস্থ শরীরের পাশাপাশি সুস্থ মস্তিষ্কও আল্লাহর বড় নিয়ামত। তাই অবসর ও কর্মক্ষম সময়কে শুধু বিনোদন বা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় না করে কোরআন-হাদিস অধ্যয়ন, দ্বীনি জ্ঞান অর্জন এবং অর্জিত উপকারী জ্ঞান অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

মানুষের পাশে দাঁড়ানো

মানুষের সেবা করার জন্য শারীরিক সক্ষমতার প্রয়োজন হয়। অসুস্থ ব্যক্তির দেখাশোনা, বৃদ্ধ মা-বাবার সেবা, অসহায় আত্মীয়ের সহযোগিতা কিংবা বিপদে পড়া প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো—এসব কাজ সুস্থ মানুষ সহজেই করতে পারেন।

নিজের হাত, পা, শ্রম ও সময়কে অন্যের উপকারে ব্যবহার করাও সুস্থতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি বাস্তব মাধ্যম।

হালাল জীবিকার জন্য পরিশ্রম

সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা কাজে লাগিয়ে হালাল জীবিকা অর্জন করাও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের প্রয়োজন পূরণ, নিজের দায়িত্ব পালন এবং বৈধ উপায়ে উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করা নেক নিয়তে ইবাদতে পরিণত হতে পারে।

নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে পরিবার ও সমাজের জন্য উপকারী হওয়া একজন মানুষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

ভালো কাজে সহযোগিতাও সুস্থতার ব্যবহার

শুধু নিজে ভালো কাজ করাই নয়, অন্যকে ভালো কাজে সহযোগিতা করাও একজন মুমিনের দায়িত্ব। কারও চিকিৎসায় সহায়তা করা, অসহায় ব্যক্তিকে চলাফেরায় সহযোগিতা করা, বিপদগ্রস্ত কাউকে উদ্ধার করা, মসজিদ-মাদরাসার কাজে শ্রম দেওয়া কিংবা সামাজিক কোনো কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকলে তা গ্রহণ করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

অর্থাৎ নিজের সামর্থ্য এমন কাজে ব্যবহার করা উচিত, যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।

সুস্থ থাকার জন্য শরীরের যত্নও জরুরি

ইসলাম ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের শারীরিক প্রয়োজনের প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। নিজের শরীরকে অবহেলা করে এমনভাবে ইবাদত করা উচিত নয়, যাতে স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে ক্ষতি হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৬৮)

তাই সুস্থতা ধরে রাখার জন্য পরিমিত খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় শারীরিক পরিশ্রমের বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার। সুস্থ শরীর যত বেশি কর্মক্ষম থাকবে, একজন মানুষ তত বেশি ইবাদত, পরিবার ও সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবেন।

‘পরে করব’—এই মানসিকতা থেকে বের হতে হবে

সুস্থতার সময় মানুষের একটি বড় ভুল হলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া। মনে হয়, নামাজ পরে পড়া যাবে, কোরআন পরে পড়া যাবে, মা-বাবার সেবা করার সুযোগও পরে পাওয়া যাবে। কিন্তু জীবন সব সময় মানুষের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না।

আজ যে ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে হাঁটছেন, কাল হয়তো অসুস্থতার কারণে বিছানা থেকে উঠতেও পারবেন না। আজ যে ব্যক্তি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ইবাদত করতে পারছেন, ভবিষ্যতে হয়তো অল্প সময় দাঁড়ানোও তার জন্য কষ্টকর হয়ে যেতে পারে।

তাই সুযোগ থাকা অবস্থাতেই ভালো কাজ করে নেওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৩৪)

সুস্থতা তাই কেবল স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপনের সুযোগ নয়; এটি নেক আমল করারও একটি বড় সুযোগ। শরীর ও সময়—দুটিই যখন আল্লাহ দিয়েছেন, তখন এগুলোকে অর্থহীন কাজে নষ্ট না করে ইবাদত, জ্ঞানার্জন, হালাল উপার্জন, পরিবার ও মানুষের সেবায় কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

কারণ সুস্থতা চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু সুস্থ অবস্থায় করা ভালো কাজের প্রতিদান মানুষের জন্য দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণের কারণ হতে পারে।

Link copied!