• ঢাকা
  • সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
বাংলাদেশি ম্যাকগাইভার লিপু

আবার পদ্ম ফুল ফুটবে, সবার হাতে শোভা পাবে


ইমতিয়াজ আমিন জানুয়ারি ১৫, ২০২৩, ০৩:৪১ পিএম
আবার পদ্ম ফুল ফুটবে, সবার হাতে শোভা পাবে

সুপার কার ডিজাইনার নিজামউদ্দিন আউলিয়া লিপু

ঢাকা: পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, তিনি একজন বাংলাদেশি সুপার হিরো। নিজেকে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন বাংলাদেশি ম্যাকগাইভার হিসেবে। নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসা তাকে এনে দিয়েছে জগতজোড়া খ্যাতি। লোহালক্কড় পিটিয়ে নিজ হাতে পুরোনো ভাঙাচুড়া গাড়িকে নিজস্ব ডিজাইনে স্বপ্নের সুপারকারে পরিণত করেন তিনি। পরিচিতি পেয়েছেন গাড়ির জাদুকর হিসেবে। তিনি বাংলাদেশি গাড়ির ডিজাইনার নিজামউদ্দিন আউলিয়া লিপু।

১৯৯৪ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে ‘লিমু-বিল’ নামে নিজের স্বপ্নের গাড়ি নির্মাণ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর কতশত গাড়ি বানিয়েছেন লিপু।ডাইহ্যাসটু, টয়োটা, হোন্ডা, ফেরারিসহ নামিদামী সব ব্র্যান্ডের গাড়ির কাস্টমাইজড করে সবার মন জয় করেছেন তিনি। 

ল্যাম্বরগিনি ডায়াব্লো মডেলের অনুকরণে বানিয়েছিলেন স্বপ্নের গাড়ি ‘লিপু’। রিকশা বানানোর ধাতব শিট ব্যবহার করে মাত্র ৪০ দিনে বানিয়ে ফেলেছেন ২২ ফুট লম্বা লিমুজিন গাড়ি।নাম দেন ‘স্বাধীনতা ৭১’। পুরোনো টয়টা স্প্রিন্টারকে ভেঙে বানিয়েছেন অত্যাধুনিক ‘এম২৬’। টয়টা ক্রাউন গাড়িকে মডিফাই করে বানিয়েছেন ‘দ্যা পিস কার’। গাড়িটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। নিজের দাদার নামে ‘সুরুজ’ গাড়িটির নামকরণ করেছিলেন। গ্যাস, তেল এমনকি বিদ্যুতেও চলবে এই গাড়ি। আর দাম পড়বে মাত্র আড়াই লক্ষ টাকা। তার তৈরি ‘লিপু দ্যা এঞ্জেল কার’ নামের গাড়িটি লন্ডনের ব্রিক লেনের বৈশাখী মেলায় প্রদর্শিত হয়েছিল। বার্নি ফাইনম্যানকে সঙ্গী করে ডিসকভারি চ্যানেলের জন্য মাত্র ৩ সপ্তাহে দুটি গাড়ি বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। 

এতকিছুর পরেও দেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তিনি অনেকটাই আড়ালে। ২০১৩ সাল থেকে স্বপরিবারে থিতু হয়েছেন সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে। মার্কিন সরকার তার কাজের মূল্যায়ন করে সর্বোচ্চ অভিবাসন সুবিধা প্রদান করেছে। লিপুর কথায় ‘গোটা আমেরিকাতে ৫৬০ জনের মধ্যে তিনি একজন যাকে এই সম্মানে সম্মানিত করা হয়েছে।’

এই গাড়ির জাদুকরের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয় সোনালীনিউজের। কথাশুনে মনে হলো একেবারেই দিলখোলা মানুষ তিনি। আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ নিজামউদ্দিন আউলিয়া লিপু মুহূর্তেই আপন করে নিতে পারেন যে কাউকে। কাজের মাধ্যমে বিশ্বজোড়া খ্যাতি তার অথচ কথাবার্তায় একেবারেই সাধারণ একজন মানুষ। লোহালক্কর পিটিয়ে দামি দামি সব সুপারকার তৈরি করা এই মানুষটি দেশের টানে মাঝে মধ্যে ছুটে আসেন নিজ জন্মভূমিতে। তবে এই বাংলাদেশ তাকে কতটুকু মূল্যায়ন করতে পেরেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে!

সম্প্রতি আফগানিস্তানের একদল তরুণ দীর্ঘ ৫ বছরের প্রচেষ্টায় বানিয়েছেন ‘এন্টপ’ নামের প্রথম অটোমোটিভ ব্র্যান্ডের কার।কিন্তু বাংলাদেশে ঠিক এরকম ভাবেই এক ২৬ বছরের তরুণের উদ্ভব হয়েছিলো ১৯৯৪ এর অক্টোবরের দিকে৷ একের পর এক গাড়ি বানিয়ে তোলপাড় ফেলে দেন বিশ্বজুড়ে। তবে অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশ এতো বড় একটা সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। আমাদের লিপু হয়ে গেছে যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশের সম্পদ।

বিষয়টিকে লিপু কীভাবে দেখেন, আসলেই বাংলাদেশ তাকে মূল্যায়ন করতে পারেনি?

একটু ঘুরিয়ে জবাব দিলেন তিনি। বললেন, ‘বিষয়টি একেবারেই আলাদা। গোবরে পদ্মফুল ফোটে জানেনতো, সার যথেষ্ট আছে, পদ্মফুল ফুটছে কিন্তু সেই পদ্মফুলকে মর্যাদা দেওয়ার মতো কোনো মানুষ আশেপাশে ছিলো না।তাহলে এটাকে কী বলবেন, ব্যর্থতা কার, কারো ব্যর্থতা নেই।’ 

লিপু বলেন, ‘কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। পদ্মফুলের সৌন্দর্য দেখার মতো কোনো মানুষ তখন ছিলো না, ওই চোখই তো ছিলো না। মানুষ ছিলো অন্ধ-বধির।এখন কাউকে ব্লেম দেয়া ঠিক না। পদ্মফুলকে যে সম্মান দিতে পারবে সে নিয়ে যায়।’

কথা কথায় ২০০৯ সালের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করেন লিপু। বলেন, ‘আমাকে যে কনভিন্স করতে পেরেছিল একসময়, নাম বলবো না, তিনি বলেছিলেন, লিপু-তুমি সময়ের অনেক আগে এসেছে। তুমি যা অর্জন করতে চাও, সে সময় বাংলাদেশে এখনও আসেনি। আসবে তবে অনেক সময় লাগবে, তোমার মর্যাদা পৃথিবীতে হবে।’ 

‘তবে এখন মনে হচ্ছে সেই সময়টা আসছে, আবার পদ্মফুল ফুটবে এবং মানুষের হাতে হাতে শোভা পাবে।’ 

যদিও নিজেকে গোবরে পদ্মফুল বলতে নারাজ এই গাড়ির জাদুকর। বলেন, ‘সব ফুলে কিন্তু ফল হয় না। একটা গাছের ফুল থেকে তখনই ফল হবে যখন গোড়া থেকে সে সম্পূর্ণ জিনিসটা পাবে। ১৯৫৫ সালে ইস্ট পাকিস্তান এবং ওয়েস্ট পাকিস্তান থেকে দুইজন আমেরিকাতে স্কলারশিপ পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে আমার বাবা একজন। আমি সেই বাবার সন্তান, এটা আমার জেনেটিক।’    

কাজ নিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছেন কিনা, এমন প্রশ্নে মান্না দে’র দু’লাইন গান শোনালেন লিপু। ‘‘স্বপন যদি মধুর এমন, হোক সে মিছে কল্পনা জাগিও না আমায়, জাগিও না।’ সুতরাং স্বপ্ন যদি সফলই হয়ে যায় তাহলে আমাকে আর ডাক দিও না। স্বপ্ন একটা চলমান প্রসেস। এটা ট্রান্সফার হয় ম্যান টু ম্যান, জেনারেশন টু জেনারেশনে। হাজার হাজার মানুষ সেই স্বপ্নের সাথে সংযুক্ত হয়। এটাকে বলে স্বপ্ন। আমেরিকায় এসে একটা বাড়ি কিনবো, এত মিলিয়ন ডলার ব্যাংকে থাকলে, ১০টা গাড়ি থাকলে আমার আর কিছু লাগবে না। ওই মানুষটাই যখন সব কিছু পেয়ে যাবে একটা না ১০টা বাড়ি কিনবো, ২০টা গাড়ি কিনবো। অর্থাৎ স্বপ্ন পরিবর্তন হয়।’’ 

আরও বলেন, ‘একজন মানুষ কোনোদিন তার সর্বোচ্চ কর্ম সম্পাদন করতে পারে না। সে চায় আরো ভালো কিছু করতে হবে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একজন সৎ কর্মী বা মানুষ চেষ্টা করে যায়। এখানে অর্জন বলতে কিছু নেই। যে মানুষটা ওই পর্যায়ে চলে যায় তার জন্য অর্জন না, বিসর্জন হয়ে দাঁড়ায়। এবং এই বিসর্জন দেওয়ার জন্যই সে কাজ করে যায়।’

‘আমার কোনো কাজ যদি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয় তাহলে আমি আছি, না হলে নেই।’ 

লিপু বলেন, ‘আমার কাজ নিয়ে হিস্টিরি চ্যানেল-ডিসকভারি চ্যানেল পর্যন্ত পৌঁছেছি।এটা যথেষ্ট। আমার আর নাম কামানোর কিছু নেই। সেখানে আমাকে যেভাবে দেখানো হয়েছে সেটা হচ্ছে ‘ম্যাকগাইভার’। গাড়ি ডিজাইনিংয়ের ম্যাকগাইভার। আমি এটা যদি কোনো সৎ কাজে ব্যবহার করতে পারি ভালো কিন্তু আকামে ব্যবহার করতে রাজি না।’ 

কাজ করতে করতে জীবন-শরীর সব তামা হয়ে গেছে উল্লেখ করে লিপু বলেন, ‘‘আমার সারা শরীরের জয়েন্ট ‘ইজ ফাক্কা’ সোজা কথা, স্টিল ওয়াককিং। টাকার তোয়াক্কা করিনি। উন্নতির তোয়াক্কা করিনি। আমার যা মন চায় তাই করেছি এখনও করে যাচ্ছি। আইএম ইন মাই ওয়ার্কশপ রাইট নাউ। আমি সারা রাত ব্যয় করি ক্যালিফোর্নিয়ার এই ওয়ার্কসপে। বড় কোনো ওয়ার্কশপের মালিক হলে মাসে কোটি টাকা কামাতে পারেন। আমার ওই স্বপ্ন কোনো দিন ছিলোও না এখনও নেই। আই জাস্ট ক্যারি অন মাই ওয়ার্ক।’’

তিনি বলেন, ‘আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে মিলিয়নিয়ার হয়ে যেতে পারতাম। সৌদি রয়েল ফ্যামেলি অফর মি, হোয়াট ইউ ওয়ান্ট ইন দিজ ওয়ার্ল্ড, কাম টু আস। কিন্তু আমি যায়নি। আই এম নট ফর সেল। আমি নিজেকে এতো খাটো করতে পারবো না। আমি জানি ‘হু আই এম’।

লিপুর জন্ম বাংলাদেশে ১৯৬৮ সালে। ঢাকার ছেলে লিপু ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলে। কিন্তু এরপরই তিনি বাবার চাকরির সুবাদে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান সৌদি আরবে। সেখানে ১৬ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো একটি মোটর শো’তে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেদিন চোখ ধাঁধানো সব গাড়ি দেখে তার চিন্তা আর স্বপ্নে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। সেদিন তাকে সবচাইতে বেশি আকৃষ্ট করেছিল ফেরারি গাড়ি এবং দুর্দান্ত সব রেসিং গাড়িগুলো। মনে মনে ভাবতে লাগলেন নিজের যদি এমন একটা গাড়ি থাকতো! কিন্তু সেসময় তার এত দামী গাড়ি কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং গাড়ি ডিজাইনিং এর স্বপ্ন সেই কৈশোর বয়স থেকেই লালন করেছিলেন তিনি। নিজের গাড়ি নিজেই বানাবেন আর ডিজাইন করবেন এই দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে অটল থেকেছেন। স্বপ্ন দেখেছেন একটা ল্যাম্বারগিনি বানাবেন।

লিপুর ল্যাম্বরগিনির স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। একটা সিডান গাড়িকে ভেঙ্গে নিজের মতো করে বানিয়েছিলেন ল্যাম্বরগিনি ক্রাউন্টেশ। কিন্তু গাড়িটির নামকরণ করেছিলেন লিম-বিল। তখনো অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে তার জ্ঞান ততটা শক্ত হয়নি। কিন্তু নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে ঠিকই ধারণা পেয়েছিলেন। তাই স্বপ্ন দেখতে লাগলেন বানাবেন বাংলাদেশি লিমুজিন! কোন অটো মেকানিজম না জেনে, একটা ল্যাম্বারগিনির পোস্টার দেখেই যিনি ল্যাম্বরগিনি গাড়ির মডেল দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারেন। তার পক্ষেই এমন স্বপ্ন দেখা সম্ভব।

২০০০ সালের কথা। ঢাকায় ফিরে তিনি নিজের ব্যবসা শুরু করেন। কয়েকটি পুরনো গাড়ি জোড়া দিয়ে নিজের ডিজাইনে তৈরি করলেন লিমুজিন। ২.৮ লিটার ডিজেল ইঞ্জিনের সাহায্যে, মাত্র ৪০ দিন সময় নিয়ে এই গাড়িটি বানাতে তাকে সহায়তা করেছেন তার ছোটভাই দিপু। তার বানানো ২৮০০ সিসির লিমুজিনটি দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি লিমুজিন গাড়ির বিলাসবহুল বৈশিষ্টও ছিল নজরকাড়া। ইন্টারকম, টিভি, পানি রাখার ক্যাবিনেট সহ গাড়িটি বানিয়েছিলেন। ঢাকার রাস্তায় তার লিমুজিন দেখে মানুষের কপালে চোখ উঠে যেত!

লিপু তার জিগাতলার বাসার গ্যারেজেই গাড়ি নিয়ে কাজ করতেন। লিমুজিন বানাবার পর তিনি ফিরে যান তার প্রথম প্রেম ফেরারির কাছে। ২০০২ সালের শেষ দিকে চারজন মেকানিককে সাথে নিয়ে শুরু করেন ফেরারি তৈরি কাজ। মূল ফেরারির ডিজাইন থেকে শুধুমাত্র একজোড়া লাইট এবং মনোগ্রামগুলো ধার করেছিলেন। বাদবাকি সমস্ত ডিজাইন ছিল তার করা। তিনি এই গাড়িটি বানাতে যে ধাতব শিট ব্যবহার করেছিলেন সেগুলো মূলত ঢাকায় চলিত রিকশায় ব্যবহৃত হয়। গাড়িটির নাম দেন ‘স্বাধীনতা-৭১’!

মূলত স্বাধীনতা -৭১ বানাবার পরেই তার ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায়। ২০০৩ সালে বিবিসিতে তাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনের পরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন লিপু। ফেরারি ওনার্স ক্লাবের মূল ওয়েবসাইটে স্থান দেয়া হয় তাকে। সেখানে তার গাড়িকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় দ্যা বাংলাদেশ ফেরারি হিসেবে।

অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য পাড়ি জমান আমেরিকায়। মিশিগানের জেনারেল মোটরস ইন্সটিটিউটে ভর্তি হয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু পুথিগত বিদ্যায় বিরক্ত হয়ে পড়াশোনাই ছেড়ে দেন। আবার ফিরে আসেন বাংলাদেশে। পুনরায় শুরু করেন নিজের ওয়ার্কশপ। টানা তিন বছর তিনি এই ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেন। তিনি মূলত মানুষের পছন্দমাফিক গাড়ি বানিয়ে দিতেন। মূলত কাস্টমাইজ গাড়ি তৈরিই ছিল তার ওয়ার্কশপের প্রধান কাজ। ইতোমধ্যে ফ্রান্সেও বিখ্যাত হয়ে ওঠেন তিনি। ২০০৪ সালে ফ্রান্সের ইন্টারসেকশন পত্রিকায় তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করা হয়েছিল।

২০০৬ সালে ঢাকা মোটর শো তে তার বানানো গাড়ি এম২৬ প্রদর্শিত হয়েছিল। গাড়িটির ডিজাইন এতটাই আধুনিক ছিল যে, কেউ একবারের জন্যও ভাবতে পারেনি গাড়িটি ২২ বছরের পুরোনো টয়টা স্প্রিন্টারকে ভেঙ্গে বানানো হয়েছিল। এর পরই বানান ‘দ্যা পিস কার’। তিনি এই গাড়িটি বানিয়েছিলেন পুরোনো একটি টয়টা ক্রাউন গাড়িকে মডিফাই করে। এই গাড়িটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে স্থান পেয়েছে।

সেবছরই যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে মাইগ্রেশনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে তিনি কার ট্রান্সফরমেশন প্রকল্পের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। এই প্রকল্পে একটি ফোর্ড গাড়িকে নিজের সৃজনশীলতা এবং দক্ষতায় আরো স্টাইলিশ ডিজাইনে রূপান্তর করেছিলেন। গাড়িটির নাম দিয়েছিল ‘কার’ । এই গাড়িতি নিয়ে পরে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এই গাড়িটি লন্ডনের রিচ মিক্স সেন্টারেও প্রদর্শিত হয়েছিল।

এরপরই তিনি চলে আসেন ডিসকভারি চ্যানেলের পর্দায়। ‘বাংলা ব্য্যঙ্গারস’ নামের এই অনুষ্ঠানে ঢাকায় কাস্টমাইজ গাড়ি তৈরি নিয়ে ফিচার করা হয়েছিল লিপু এবং বার্নি ফাইনম্যানকে। এই অনুষ্ঠানে দেখানো হয় কীভাবে লিপু আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই স্টাইলিশ গাড়ি নির্মাণ করেন। ডিসকভারি থেকে তাকে ৮ সপ্তাহ সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল দুটি গাড়ি বানানোর জন্য। বার্নি ফাইনম্যানকে সঙ্গী করে তিনি ৩ সপ্তাহের মধ্যেই গাড়িগুলো বানিয়ে দেখিয়েছিলেন।

২০০৭ সালে লিপু দ্যা এঞ্জেল কার নামের একটি গাড়ি তৈরি করেছিলেন। গাড়িটি লন্ডনের ব্রিক লেনের বৈশাখী মেলায় প্রদর্শিত হয়েছিল।

বাংলা ব্যাঙ্গারস অনুষ্ঠানের সিকুয়্যাল দ্যা চপ শপ লন্ডন গ্যারেজেও উপস্থিত ছিলেন লিপু এবং বার্নি ফাইনম্যান।এই অনুষ্ঠানে তারা দুইজন নামকড়া সব সেলিব্রেটিদের গাড়ি কাস্টমাইজ করে দেয়ার একটি রিয়েলিটি শো করতেন। এই রিয়েলিটি শোর মূল চ্যালেঞ্জ ছিল ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুসারে কম খরচে কাস্টমাইজ গাড়ি প্রস্তুত করে দেয়া।

লিপু যে শুধু নিজের জন্য বা সেলিব্রেটিদের জন্য গাড়ি তৈরি করেন তা নয়। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেও তিনি অনেক গাড়ি তৈরি করেছেন। ২০১১ সালে তিনি দেশে ফিরে এসে তৈরি করেন ‘সুরুজ’ নামের একটি গাড়ি। তার দাদার নামে গাড়িটির নামকরণ করেছিলেন। গ্যাস, তেল এমনকি বিদ্যুতেও চলবে এই গাড়ি। আর দাম পড়বে মাত্র আড়াই লক্ষ টাকা।

২০১৫ সালে তিনি আবার হাজির হন হিস্টোরি চ্যানেলে। বিশ্ব দেখে এক বাংলাদেশী গাড়ি জাদুকরকে। যার হাতের ছোঁয়ায় পুরনো ভাঙ্গাচোরা গাড়িও হয়ে অত্যাধুনিক সুপার কার! হিস্টোরি চ্যানেলে স্টিভ পিটবুলের ট্রিম্বলির গ্যারেজ নিয়ে লিপু অ্যান্ড পিটবুল নামে একটি রিয়েলিটি শো অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পিটবুলের সাথে ছিলেন বাংলাদেশি লিপু। এই অনুষ্ঠানে তারা দেখাতেন কীভাবে পরিত্যাক্ত গাড়ি সুপারকারে রূপান্তর করা যায়। যা আবার বাণিজ্যিকভাবে বিক্রিও করা হয়!

নিজ একাগ্রতা এবং ধৈর্যকে পুঁজি করে তিনি বিশ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার এই অভাবনীয় কৃতিত্বর সম্মানস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্র তাকে সর্বোচ্চ অভিবাসন সুবিধা দিয়েছে। 

সোনালীনিউজ/আইএ

Wordbridge School