একসময় নুন আনতে পানতা ফুরোনোর সংসার ছিল নাটোরের লালপুর উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের মুর্শিদা খাতুনের। স্বামী নুরুল ইসলাম ছিলেন বেকার। সংসার চলত একটি সেলাই মেশিনের সামান্য আয়ে। অভাব-অনটনের সেই দিনগুলো পেরিয়ে আজ তিনি প্রায় ১৫ লাখ টাকার খামারের মালিক। অদম্য পরিশ্রম, ধৈর্য আর মাত্র ১০ হাজার টাকার একটি ক্ষুদ্র ঋণকে পুঁজি করে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের সফলতার গল্প।
২০১০ সালে লালপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নেন মুর্শিদা খাতুন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি মাত্র ১০ হাজার টাকা ঋণ পান। সেই টাকা দিয়ে একটি গাভী কিনে শুরু করেন গরু পালন। ছোট সেই উদ্যোগই সময়ের সঙ্গে বড় খামারে রূপ নেয়। বর্তমানে তার নিজস্ব খামার ‘গ্রামীণ অ্যান্ড ডেইরি অ্যাগ্রো ফার্ম’-এ রয়েছে প্রায় ২০টি গরু, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এই খামার থেকে বছরে প্রায় চার লাখ টাকার আয় করছেন তিনি।
সরেজমিনে জানা যায়, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই মুর্শিদার বিয়ে হয়। অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয় তাকে। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতি তাকে থামাতে পারেনি। ধীরে ধীরে গরুর সংখ্যা বাড়িয়ে নিজের স্বপ্নের খামার গড়ে তুলেছেন তিনি।
শুধু গরু পালনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি মুর্শিদা। খামারকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন বহুমুখী উদ্যোগ। গরুর গোবর দিয়ে বায়োগ্যাস তৈরি করে পাশের কয়েকটি বাড়িতে গ্যাস সরবরাহ করছেন। সেই বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে উৎপন্ন জৈব সার ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিকাজে। পাশাপাশি বাড়ির পাশের বড় পুকুরে মাছ চাষ করছেন এবং বাড়ির উঠানেই পালন করছেন হাঁস-মুরগি। ফলে তার খামার এখন একটি সমন্বিত কৃষি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
গ্রামে এখন মুর্শিদার সাফল্যের গল্প অনেকের মুখে মুখে। তার খামার দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক নারী গরু পালন শুরু করেছেন। কেউ কেউ তার কাছ থেকেই পরামর্শ নিচ্ছেন।
একই গ্রামের জরিনা বেগম বলেন, “মুর্শিদা আপার খামার দেখে সাহস পেয়েছি। আগে ভাবতাম গরু পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু তার পরামর্শে এখন আমিও গরু পালন শুরু করেছি।”
আরেক নারী সমতা বলেন, “মুর্শিদা আপা আমাদের অনেক সহযোগিতা করেন। তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে গরু পালন শুরু করেছি। এখন ধীরে ধীরে খামার বড় করার স্বপ্ন দেখছি।”
মুর্শিদা খাতুন বলেন, “যুব উন্নয়ন অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ১০ হাজার টাকা ঋণ পাই। সেই টাকায় একটি গাভী কিনে গরু পালন শুরু করি। পরে ধীরে ধীরে গরুর সংখ্যা বাড়াতে থাকি। এখন নিজের একটি বহুমুখী খামার আছে, সংসারও ভালোভাবে চলছে। আমি চাই, আমার মতো গ্রামের অন্য নারীরাও আত্মনির্ভরশীল হোক।”
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে তার খামার আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং আশপাশের নারীদেরও এই কাজে যুক্ত করতে চান।
লালপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুস সবুর বলেন, “মুর্শিদা খাতুন আমাদের সফল নারী উদ্যোক্তাদের একজন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র ঋণকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের জীবন বদলে দিয়েছেন। তার সাফল্য দেখে গ্রামের অনেক নারী এখন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।”
নাটোর জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নীলা সাফিয়া বলেন, “মুর্শিদা খাতুনের মতো নারীরা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তারা শুধু নিজের পরিবারই নয়, আশপাশের মানুষকেও অনুপ্রাণিত করছেন। নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কার্যক্রম আরও বাড়ানো হলে এমন সাফল্যের গল্প আরও তৈরি হবে।”
নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, “গ্রামের নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। মুর্শিদা খাতুনের মতো উদ্যোক্তারা প্রমাণ করেছেন, সুযোগ ও প্রশিক্ষণ পেলে নারীরাও সফল হতে পারে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
অভাবের সংসার থেকে আত্মনির্ভরতার এই যাত্রা এখন লালপুরের অনেক নারীর জন্য অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে। মুর্শিদা খাতুনের স্বপ্ন—তার খামার আরও বড় হবে, আর সেই খামারের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে গ্রামের অনেক নারীর জন্য।
এম