শেবাচিমে ভুল ইনজেকশনে দুই নারীর মৃত্যু, তদন্তের নির্দেশ আদালতের

  • বরিশাল প্রতিনিধি   | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২৬, ১০:২০ এএম
ছবি : প্রতিনিধি

বরিশাল: বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শেবাচিম এ অপারেশনের আগে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে দুই নারী রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। 

সোমবার (১৬ মার্চ) ঘটনাটি বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নজরে আসে আদালতের।

বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অব দ্য পিস এস এম শরিয়ত উল্লাহ এ ঘটনায় বিস্তারিত অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনারকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার নিচে নয় এমন একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করতে হবে এবং আগামী ৯ এপ্রিল এর মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে ।

রোববার (১৫ মার্চ)  বরিশালের শেবাচিম হাসপাতালের চতুর্থ তলায় নাক-কান-গলা ইএনটি বিভাগে এ ঘটনা ঘটে। ওই দিন অপারেশনের আগে ভুল ইনজেকশন প্রয়োগের অভিযোগে দুই নারী রোগীর মৃত্যু হয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

নিহত দুই রোগী হলেন-পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ডাবুগঞ্জ গ্রামের মান্নানের স্ত্রী শেফালী বেগম (৬০) এবং বরিশাল নগরীর কাশিপুর এলাকার মৃত বাবু হাওলাদারের স্ত্রী হেলেনা বেগম (৪৫)। তারা দুজনই হাসপাতালের মহিলা ইএনটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শেফালী বেগম ৭ নম্বর বেডে এবং হেলেনা বেগম ১০ নম্বর বেডে ভর্তি ছিলেন।

স্বজন ও ওয়ার্ডে থাকা অন্যান্য রোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, শেফালী বেগম গালের টিউমারজাতীয় সিস্ট এবং হেলেনা বেগম থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। রোববার সকালে তাদের অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। অভিযোগ রয়েছে, অপারেশনের প্রস্তুতির সময় কর্তব্যরত সিনিয়র স্টাফ নার্স ভুলবশত এনেস্থেসিয়া ইনজেকশন প্রয়োগ করেন।

রোগীর স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইনজেকশন দেওয়ার মাত্র দুই থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে একে একে দুই রোগী অচেতন হয়ে পড়েন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মৃত্যু হয়। এতে ওয়ার্ডে থাকা স্বজনদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারা দাবি করেন, দুই রোগীই ইনজেকশন দেওয়ার আগে স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন।

ঘটনার পর অভিযুক্ত নাক-কান-গলা বিভাগের সিনিয়র নার্স মলিনা রানী হালদার নিজের ভুল স্বীকার করে বলেন, কীভাবে এমনটি ঘটেছে তিনি বুঝতে পারছেন না এবং তার ভুল হয়েছে। একই ধরনের মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্ট আরেক সিনিয়র নার্সও।

এ বিষয়ে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম মশিউল মুনীর বলেন, ওই দিন দুই রোগীর অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। অপারেশনের আগে ও অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার সময় কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ প্রয়োগ করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নার্সরা নির্ধারিত সময়ের আগেই এনেস্থেসিয়া ইনজেকশন প্রয়োগ করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এতে তাদের দায়িত্বে গাফিলতির বিষয়টি সামনে এসেছে।

ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে ইএনটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আমিনুল হককে। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন হাসপাতালের উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক শাহানাজ পারভীন এবং ইএনটি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. আল মামুন খান। এছাড়া নিহতদের স্বজনরা আইনি ব্যবস্থা নিতে চাইলে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করার কথাও জানান হাসপাতাল পরিচালক।

আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, প্রকাশিত সংবাদ সঠিক হলে তা একটি গুরুতর আইনের লঙ্ঘন এবং ইচ্ছাকৃত অবহেলা হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বর্তমানে এ বিষয়ে কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কি না, তাও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইনজেকশন প্রদানকারী নার্সের প্রয়োজনীয় ডিগ্রি, সনদ ও অভিজ্ঞতা ছিল কি না, অপারেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক সে সময় উপস্থিত ছিলেন কি না, অপারেশনের আগে প্রি-এনেস্থেসিয়া চেকআপসহ নির্ধারিত চিকিৎসা মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো প্রশাসনিক বা পেশাগত অবহেলা ছিল কি না।

এছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, চিকিৎসা সেবার সঙ্গে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের প্রশ্ন জড়িত। একজন অসুস্থ মানুষ চিকিৎসক ও হাসপাতালের ওপর আস্থা রেখে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তাই চিকিৎসায় সামান্য অবহেলাও রোগীর সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের শামিল হতে পারে এবং তা তার জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে।

আইন অনুযায়ী চিকিৎসা অবহেলায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে তা দণ্ডবিধির ৩০৪ক, ৩৩৬, ৩৩৭ ও ৩৩৮ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলেও আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় খসড়া মানচিত্র প্রস্তুত, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ এবং ঘটনার সময়, স্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত কাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিএস