ছয় বছর আগে এক দুর্ঘটনায় বাবা কামাল হোসেনকে হারিয়েছিল ১২ বছরের জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। অভাবের সংসারে হাল ধরতে রায়পুর শহরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ নেয় সে। তিন বোনসহ পাঁচজনের সংসারের ভার ছিল তার কাঁধে। কিন্তু এক দিনেই সেই সাজানো সংসার লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। মা ও তিন বোনকে হারিয়ে ১৮ বছরের সিফাত এখন বাকরুদ্ধ। কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পৃথিবীতে আপন বলতে আর কেউ রইল না তার।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে রায়পুর শহরের ধানহাটা সংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে একটি ভাড়া বাসায় সিফাতের মা শাহিনুর আক্তার (৩৮), বড় বোন সায়মা আক্তার (২০), মেজো বোন নাফিসা আক্তার ইকরা (১৬) ও ছোট বোন সিফা আক্তারকে (৯) কুপিয়ে খুন করা হয়। পরে স্থানীয় লোকজনের গণপিটুনিতে মারা যায় সন্দেহভাজন ঘাতক অন্তর মজুমদার (২৮)। সে নিহতদের পূর্বপরিচিত ছিল। তবে ঠিক কী কারণে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা এখনো অজানা। সন্দেহভাজন ঘাতকের মৃত্যু হওয়ায় পুলিশ এখনো এই রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি।
ঘটনার পর শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়া সিফাত শুধু জানিয়েছে, ঘটনার আগেই সে কর্মস্থলের উদ্দেশে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। কিছুক্ষণ পরই সে এই হৃদয়বিদারক খবর পায়। সিফাতের বড় বোন সায়মা আক্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। মেজো বোন ইকরা এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ফলের অপেক্ষায় ছিল। আর ছোট বোন শিফা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। সিফাত নিজে রায়পুর সরকারি কলেজে এইচএসসিতে অধ্যয়নরত।
স্থানীয়রা জানান, সিফাত ও তার তিন বোনই অত্যন্ত মেধাবী ছিল। সিফাতের বাবা কামাল হোসেন (৫০) গ্রামে গ্রামে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন। ২০১৯ সালের ২৯ মে রায়পুরের কেরোয়া ইউনিয়নে ঘাড়ে করে হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে যাওয়ার সময় বিদ্যুতের ছেঁড়া তারে জড়িয়ে তিনি মারা যান। তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর রায়পুরের ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন। তাঁর মৃত্যুর পরও পরিবারটি সেখানেই থেকে যায়।
ঘটনার পর থেকে সিফাত কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় নেই। প্রথমে ঘটনা শুনে বাসায় গিয়ে বুক চাপড়ে তার কান্নার দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবার চোখেই পানি চলে আসে। পরে তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে রায়পুর বণিক সমিতির নেতার বাসায় নিয়ে রাখা হয়।
সিফাতের বরাত দিয়ে রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে সিফাত দোকানে আসে। বেলা ১১টার দিকে তার মা ও বোনদের কুপিয়ে হত্যার খবর আসে। দোকানের পেছনেই তাদের বাসা ছিল। পরে লোকজন জড়ো হয়ে ঘাতক যুবককে গণপিটুনি দেয় এবং পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, একই পরিবারের চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের বাড়ি কুমিল্লায়। পরিবারের একমাত্র ছেলেটিই শুধু বেঁচে আছে। নিহতদের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এসএইচ