নাটোর: নাটোরে হঠাৎ করেই বেড়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। গত বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত নাটোর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে ডায়রিয়ার উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ১৪২ জন রোগী। এর মধ্যে বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত মাত্র একদিনেই হাসপাতালে ভর্তি হন ১০৬ জন। এরপর শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত নতুন করে আরও ৩৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪০ জন।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নাটোর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান।
একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় ডায়রিয়া ওয়ার্ডসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত চাপ। রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালে রোগীর ভিড়
শুক্রবার বিকেলে নাটোর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে স্বজনদের ভিড়। হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষ ও শয্যার আশপাশে রোগী ও স্বজনদের ব্যস্ততা। কেউ রোগী নিয়ে হাসপাতালে আসছেন, আবার কেউ স্যালাইন হাতে রোগীর পাশে অপেক্ষা করছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ডায়রিয়ার উপসর্গ নিয়ে ১০৬ জন রোগী ভর্তি হন। তাদের মধ্যে ৫৯ জন পুরুষ এবং ৪৭ জন নারী ও শিশু। এরপর শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত আরও ৩৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে চিকিৎসা নিয়ে ৪০ জন রোগী বাড়ি ফিরেছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে শিশু, নারী ও পুরুষ—সব বয়সী মানুষ রয়েছেন। ভর্তি হওয়া রোগীদের একটি বড় অংশ নাটোর পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লার বাসিন্দা। এর মধ্যে কানাইখালী, কান্দিভিটা, চকরামপুর, পটুয়াপাড়া, রামাইগাছি ও বড় হরিশপুর এলাকার রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে
রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেরই হঠাৎ করে পাতলা পায়খানা ও বমি শুরু হচ্ছে। প্রথমে বাড়িতে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করলেও অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে হচ্ছে।
এক রোগীর স্বজন শিউলি বেগম বলেন, “হঠাৎ করেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। হাসপাতালে নিয়ে আসার পর দেখি অনেক রোগী ভর্তি। চিকিৎসা চলছে, তবে রোগীর চাপ অনেক বেশি।”
কান্দিভিটার বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, “বাড়িতে প্রথমে পাতলা পায়খানা ও বমি শুরু হয়। পরে অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখন চিকিৎসা চলছে।”
চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন অনেকে
হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় মোবারক হোসেন বলেন, “হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। চিকিৎসা নেওয়ার পর এখন কিছুটা ভালো লাগছে। তাই বাড়ি ফিরছি।”
আফরোজ বানু বলেন, “অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিয়েছি। চিকিৎসক ও নার্সরা দেখেছেন। এখন আগের চেয়ে ভালো আছি।”
রোগীর স্বজন আলম সরকার বলেন, “রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে আসার পর দেখি অনেক মানুষ চিকিৎসা নিতে এসেছে। দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ায় এখন রোগীর অবস্থা কিছুটা ভালো।”
আরেক স্বজন নাসরীন জাহান বলেন, “হঠাৎ করে পাতলা পায়খানা ও বমি শুরু হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে আসি। চিকিৎসা দেওয়ার পর এখন অবস্থার উন্নতি হয়েছে।”
রোগীর চাপ বাড়লেও চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিক
নাটোর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, “গত কয়েক দিনে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। রোগীর চাপ থাকলেও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্যালাইন ও অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। তাই পাতলা পায়খানা শুরু হলে দ্রুত খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি পান ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।”
সিভিল সার্জন বললেন, আতঙ্ক নয়—সচেতনতা জরুরি
নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, “রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত নতুন করে ৩৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে ৪০ জন বাড়ি ফিরে গেছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনীয় স্যালাইন ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রয়েছে।”
তিনি বলেন, “রোগীর সংখ্যা বাড়লেও আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে ডায়রিয়া প্রতিরোধে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে এবং অনিরাপদ ও খোলা খাবার পরিহার করতে হবে।”
দূষিত পানি ও অনিরাপদ খাবারে ঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে, আবহাওয়ার পরিবর্তন, দূষিত পানি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং অনিরাপদ খাবারের কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাইরে খোলা অবস্থায় রাখা খাবার ও অপরিশোধিত পানি গ্রহণের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। এতে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই পাতলা পায়খানা শুরু হওয়ার পরপরই খাবার স্যালাইন খাওয়ানো জরুরি। শিশুসহ বয়স্ক ও দুর্বল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হতে পারে বলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যবিধি মানার পরামর্শ
ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ায় আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। বিশুদ্ধ পানি পান, বাসি ও খোলা খাবার এড়িয়ে চলা, খাবার তৈরির আগে এবং খাবার খাওয়ার আগে-পরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়া এবং খাবার ঢেকে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ডায়রিয়ার উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত খাবার স্যালাইন খাওয়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নাটোর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে হঠাৎ ডায়রিয়া রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় জনমনে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হলেও রোগীদের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে আগামী দিনগুলোতে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়ে কি না, সেটিই এখন নজরদারির বিষয়।
পিএস