বীমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন 

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
ফাইল ছবি

ঢাকা: বাংলাদেশের বীমা খাতে অধিকাংশ বীমা কোম্পানি সময়মতো দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় প্রায় ১৫ লাখ বীমাগ্রহীতা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে দাবি নিষ্পত্তি না হওয়ায় খাতটিতে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। 

নন-লাইফ বীমা খাতে সাধারণ বীমা করপোরেশন থেকে প্রিমিয়াম আদায়সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি আসেনি; বরং গ্রস প্রিমিয়াম প্রবৃদ্ধি এখনও নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা ও বীমা খাতকে টেকসই করতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) একাধিক সংস্কারমূলক উদ্যোগ নিয়েছে। 

এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল বীমা কোম্পানিগুলো একীভূত করার পরিকল্পনা, ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম জোরদার করা এবং জনবল দক্ষতা বৃদ্ধি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বীমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন ও নবায়ন ফি নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত সাত বছর ধরে বীমা কোম্পানিগুলো নিবন্ধন নবায়ন ফি হিসেবে প্রতি হাজার টাকার মোট প্রিমিয়ামের বিপরীতে ১ টাকা করে পরিশোধ করে আসছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সাল পর্যন্ত এই ফি দেড় গুণ বাড়িয়ে প্রতি হাজারে ২ দশমিক ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ সাল পর্যন্ত ফি তিন গুণ বাড়িয়ে ৪ টাকা করা হবে। আর ২০৩২ সাল ও পরবর্তী সময়ের জন্য ফি চার গুণ বাড়িয়ে প্রতি হাজারে ৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আইডিআরএ থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত দেশের ৩৫টি জীবন বীমা ও ৪৫টি সাধারণ (নন-লাইফ) বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে এই নিবন্ধন নবায়ন ফি প্রযোজ্য হবে।

আইডিআরএর প্রস্তাবের ভিত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ‘বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২’ সংশোধনের কাজ শুরু করে প্রায় আট মাস আগে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ জানায়, ২০২৫ সালের ১ জুলাই খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। পরে বছরভিত্তিক ফি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।

গত মাসে খসড়াটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে আইন মন্ত্রণালয় তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ফেরত পাঠায়। প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর পুনরায় পাঠানো হয়। সর্বশেষ গত ৪ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নিবন্ধন নবায়ন ফি সর্বোচ্চ ০ দশমিক ৫ শতাংশ হারে নির্ধারণ করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিবন্ধন নবায়ন মাশুল’। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে বিধিমালা জারির সময় এই মাশুল ছিল প্রতি হাজার টাকার মোট প্রিমিয়ামের বিপরীতে ৩ দশমিক ৫ টাকা। ২০১৮ সালের ১১ জুন তা সংশোধন করে ১ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। সর্বশেষ সংশোধনে বছরভিত্তিক তিন স্তরে এই হার পুনর্নির্ধারণ করা হলো।

একটি জীবন বীমা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা এমনিতেই ভালো নয়। ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি নেই। এর ওপর বাড়তি হারে নিবন্ধন নবায়নের মাশুল আরোপ যৌক্তিক নয়। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত যদি ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর করা হতো, তাহলে খাতের জন্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হতো।

আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পুনর্বীমা বা বিনিয়োগ আয়ের ওপর কোনো চার্জ আরোপ করা হয় না। অথচ বীমা কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে প্রিমিয়ামের ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করে। সেখানে আইডিআরএ এতদিন প্রতি হাজারে মাত্র ১০ পয়সা পেয়ে আসছিল, যা এখন সংশোধন করে ২৫ পয়সা করা হয়েছে। সংশোধিত ফি কাঠামো ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আইডিআরএর বার্ষিক আয় প্রায় ১২ কোটি টাকা, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। সংশোধনের পরও আইডিআরএর আয় বেড়ে সর্বোচ্চ প্রায় ২৫ কোটি টাকায় পৌঁছাবে, যা খুব বেশি নয়। পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া কোনো স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে না।

আইডিআরএর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পলিসিধারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, বীমা খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং সুশাসনভিত্তিক সংস্কারের মাধ্যমে বীমা ব্যবহারের হার বাড়ানো।

বীমা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ফি বিধিমালা সংশোধনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে আইডিআরএ জানায়, বীমা খাতে আধুনিক ও স্বচ্ছ নজরদারি নিশ্চিত করতে ন্যাশনাল কোর ইন্স্যুরেন্স সিস্টেম (এনসিআইএস) চালু করা হচ্ছে। এই সিস্টেম বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি ডাটা সেন্টার পরিচালনা ও সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণে ভবিষ্যতে নিয়মিত ব্যয় বাড়বে।

এনসিআইএসের আওতায় ডিজিটাল অবকাঠামো ও ডাটা সেন্টার পরিচালনায় বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যা ২০২৬ সাল থেকে আইডিআরএ বহন করবে।

আইডিআরএর নিজস্ব কার্যালয় না থাকায় জমি ক্রয় ও ভবন নির্মাণ বাবদ আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকার বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে বীমা খাতে পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স একাডেমি, ইনস্টিটিউট অব অ্যাকচুয়ারি বাংলাদেশ ও রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ ফি বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি হিসেবে ভারতের উদাহরণ তুলে ধরেছে আইডিআরএ। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ভারতে মোট গ্রস প্রিমিয়াম ছিল প্রায় ৬ লাখ কোটি রুপি, যেখানে বাংলাদেশে তা ছিল প্রায় ১৮ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। ভারতে প্রতি হাজারে ১ রুপি হারে নিয়ন্ত্রণ ফি আরোপ করা হয়। তবে বাংলাদেশের বীমা বাজারের বাস্তবতা ও নিয়ন্ত্রক ব্যয় বিবেচনায় প্রতি হাজারে ৫ টাকা ফি যৌক্তিক বলে মনে করছে আইডিআরএ।

আইডিআরএর দাবি, নিয়ন্ত্রণ ফি বাড়লেও বীমা কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব সীমিত থাকবে। গ্রস প্রিমিয়ামের তুলনায় এই ব্যয় নগণ্য এবং এর ফলে গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার আশঙ্কাও কম।

আইডিআরএর ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রায় ৩৭ দশমিক ৯০ কোটি টাকা। আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বাড়তে থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নিজস্ব আয়ের উৎস শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সংশোধিত নিয়ন্ত্রণ ফি এই ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে আইডিআরএ।

এএইচ/পিএস