দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতে চলছে সংকট। দীর্ঘদিনের নানা চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রয়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি কেমন এবং সামনে জনতা ব্যাংককে কোথায় নিয়ে যেতে চান-এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন জনতা ব্যাংক পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মজিবর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোনালী নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক আবদুল হাকিম।
সোনালী নিউজ: জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমাতে এখন কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? আগামী এক বছরে কতটা কমানোর লক্ষ্য আছে?
মো. মজিবর রহমান: জনতা ব্যাংকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ আদায়। ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত হিসাবে ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭২,৮০০ কোটি টাকা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু নতুন ঋণ বিতরণ করলেই হবে না; বরং ঋণ আদায়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে।
আমরা তিনটি স্তরে কাজ করছি-
প্রথমত: প্রকৃত অর্থে সক্ষম কিন্তু সাময়িক সমস্যায় থাকা ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী পুনর্গঠন বা পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া।
দ্বিতীয়ত: ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ঋণ আদায়।
তৃতীয়ত: ঋণ বিতরণের সময়ই ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, ক্যাশ ফ্লো, জামানত এবং খাতভিত্তিক ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা।
আমাদের মূলনীতি হচ্ছে-ভালো ঋণগ্রহীতাকে সহায়তা, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং ভবিষ্যতে কোনোভাবেই খারাপ গ্রহীতাদের মাঝে ঋণ না দেওয়া।
আগামী এক বছরে খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে আমরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও অনুপাত উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হ্রাসে কর্মকৌশল নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী কাজ করছি। বিশেষ করে নতুন করে কোনো ঋণ যাতে খেলাপি না হয়, সে বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সোনালী নিউজ: নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কী পরিবর্তন আনা হয়েছে?
মো. মজিবর রহমান: নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের মূলনীতি হচ্ছে-গ্রাহকের নিজের পরিচয় নয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও ব্যবসার প্রকৃত সম্ভাবনাই হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
ঋণ অনুমোদনে ক্রেডিট অ্যাসেসমেন্ট আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। গ্রাহকের প্রকৃত ব্যবসা, নগদ প্রবাহ, ঋণের ব্যবহার, পূর্বের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং এক্সপোজার যাচাই করা হবে। বড় ঋণের ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান (due diligence), ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট এবং ঋণ বিতরণ-পরবর্তী মনিটরিং নিশ্চিত করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে ঋণ অনুমোদনের প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্ব নির্ধারণ করা হচ্ছে, যাতে সিদ্ধান্তের জন্য কে দায়ী ছিলেন তা স্পষ্ট থাকে। অর্থাৎ ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিও থাকবে। আমরা চাই, জনতা ব্যাংকের ঋণ বিতরণ হবে উৎপাদনশীল খাতে, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের মাঝে-অর্থাৎ এমন গ্রাহকের কাছে যিনি ঋণ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন।
সোনালী নিউজ: জনতা ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করতে আপনার প্রধান পরিকল্পনা কী?
মো. মজিবর রহমান: জনতা ব্যাংকের আর্থিক পুনরুদ্ধারকে আমরা চারটি স্তম্ভের ওপর এগিয়ে নিতে চাই-খেলাপি ঋণ আদায়, আয় বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং মূলধন শক্তিশালীকরণ।
প্রথমত, খেলাপি ঋণ থেকে সর্বোচ্চ বাস্তব আদায় নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সুদবহির্ভূত আয় বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে অপারেশনাল দক্ষতা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় একটি বাস্তবসম্মত মূলধন পুনর্গঠন পরিকল্পনা (capital restoration plan) বাস্তবায়ন করা হবে।
আমি মনে করি, শুধু মূলধন দিয়ে একটি ব্যাংককে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করা যায় না। অ্যাসেট কোয়ালিটি ভালো করতে হবে, আয় বাড়াতে হবে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে-এই তিনটি একসঙ্গে করতে হবে।
সোনালী নিউজ: খেলাপি ঋণ আদায় ও ব্যাংকের মূলধন বাড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
মো. মজিবর রহমান: খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আমরা এখন অনেক বেশি ফলাফলভিত্তিক পদ্ধতিতে এগোচ্ছি। বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য আলাদা মনিটরিং, বিশেষ টাস্কফোর্স, সম্পদ শনাক্তকরণ, বন্ধকী সম্পদ বিক্রয় এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে যেসব ঋণ আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আওতায় পুনর্গঠন বা পুনঃতফসিলের মাধ্যমে টেকসইভাবে নিয়মিত করা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রেও বাস্তব ক্যাশ ফ্লো ভিত্তিক সমাধান বিবেচনা করা হবে।
মূলধনের ক্ষেত্রে আমাদের কৌশল হচ্ছে-একদিকে রিকভারি বাড়িয়ে লোকসানের চাপ কমানো, অন্যদিকে আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির মাধ্যমে রিটেইন্ড আয় (retained earnings) শক্তিশালী করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে পুনঃপুঁজিকরণের (recapitalisation) উদ্যোগ নেওয়া।
আমাদের কাছে মূলধন বাড়ানো একটি লক্ষ্য, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মূলধনের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার মূল কারণ-দুর্বল অ্যাসেট কোয়ালিটি স্থায়ীভাবে সমাধান করা।
সোনালী নিউজ: আমানতকারীদের আস্থা বাড়াতে ব্যাংকের সেবা ও প্রযুক্তিতে কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে?
মো. মজিবর রহমান: আমানতকারীর আস্থা একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই আমাদের প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে-নিরাপদ, দ্রুত, সহজ ও নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা।
শাখাভিত্তিক সেবার পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার আরও বাড়ানো হবে। ‘ই-জনতা’ (eJanata)-কে আরও গ্রাহকবান্ধব করা, দ্রুত লেনদেন প্রক্রিয়াকরণ, রিয়েল-টাইম নোটিফিকেশন, নিরাপত্তা জোরদার এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
‘ই-জনতা’য় ইতোমধ্যে বাংলা কিউআর পেমেন্ট যুক্ত হয়েছে এবং নিরাপত্তা ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা উন্নয়নের জন্য নতুন সংস্করণও চালু হয়েছে।
তবে প্রযুক্তি শুধু অ্যাপ চালু করার বিষয় নয়। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে-গ্রাহক যেন ব্যাংকে না এসেও অধিকাংশ দৈনন্দিন ব্যাংকিং সেবা নিরাপদে সম্পন্ন করতে পারেন।
সোনালী নিউজ: ব্যবসা বাড়ানো, ঋণ ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে আপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?
মো. মজিবর রহমান: আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মূল কথা হলো ব্যাংকটিকে আবারও শক্ত অর্থনৈতিক ভিতের উপর স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসা। ব্যবসা বাড়াতে গিয়ে আমরা আর ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে বা একক কোনো খাতে বেশি বিনিয়োগ করব না। এসএমই, সিএমএসএমই, কৃষি, রপ্তানি, রেমিট্যান্স, গ্রিন ব্যাংকিং এবং উৎপাদনশীল শিল্পে ঋণ বাড়ানো হবে।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণ, সেক্টর-ভিত্তিক ঝুঁকির সীমা, পূর্ব-সতর্কীকরণ পদ্ধতি এবং নিয়মিত ঋণ বিতরণ-পরবর্তী তদারকি জোরদার করা হবে।
সুশাসনের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত কমানো, দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
আর ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আমাদের লক্ষ্য হবে একটি ডেটাভিত্তিক, পেপারলেস এবং কাস্টমার-কেন্দ্রিক ব্যাংক তৈরি করা। প্রযুক্তিকে শুধু লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে নয়; ক্রেডিট অ্যাসেসমেন্ট, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং কাস্টমার সার্ভিস-সব ক্ষেত্রেই ব্যবহার করতে চাই।
সোনালী নিউজ: ‘বাংলা কিউআর’ জনপ্রিয় করতে জনতা ব্যাংক কী উদ্যোগ নিয়েছে? এতে এখন পর্যন্ত সাড়া কেমন?
মো. মজিবর রহমান: বাংলা কিউআর হচ্ছে দেশের পরস্পর-সংযুক্ত বা আন্তঃকার্যক্ষম ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের মধ্যে মার্চেন্ট পয়েন্টগুলোতে প্রোপাইটারি কিউআরের পরিবর্তে বাংলা কিউআর ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছে।
জনতা ব্যাংক এ ক্ষেত্রে আমাদের শাখা ও মার্চেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ব্যবসায়ী ও গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় মার্চেন্ট অনবোর্ডিং (মার্চেন্টকে ব্যাংকিং গেটওয়েতে যুক্ত করা), কিউআর কোড স্থাপন, গ্রাহক সচেতনতা এবং ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহ দেওয়ার কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। আমাদের ই-জনতা (eJanata) অ্যাপেও বাংলা কিউআর পেমেন্ট সুবিধা যুক্ত হয়েছে।
সাড়া ইতিবাচক। ইতোমধ্যে ডিসেম্বর-২০২৬ পর্যন্ত মোট ১,০৫,০০০টি কিউআর কোড স্থাপনের টার্গেটের বিপরীতে আগস্ট-২০২৬-এর মধ্যেই ১,০৩,০০০টি মার্চেন্ট পয়েন্টে কিউআর কোড স্থাপন সম্ভবপর হয়েছে। আমরা এটিকে আরও ব্যাপক করতে চাই। তবে আমাদের কাছে শুধু কিউআর স্থাপন করাই সাফল্যের মাপকাঠি নয়-কতজন মার্চেন্ট নিয়মিত কিউআরে লেনদেন করছেন এবং মোট লেনদেন সংখ্যা কতটা বাড়ছে, সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্যের সূচক।
সোনালী নিউজ: আগামী ৩ থেকে ৫ বছরে জনতা ব্যাংককে কোথায় দেখতে চান?
মো. মজিবর রহমান: আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে আমি জনতা ব্যাংককে একটি আর্থিকভাবে শক্তিশালী, সুশাসিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং গ্রাহককেন্দ্রিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে দেখতে চাই।
আমাদের প্রথম লক্ষ্য হবে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে অ্যাসেট কোয়ালিটি উন্নত করা এবং মূলধনের ভিত্তি শক্তিশালী করা। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের আয় ও মুনাফা একটা টেকসই পর্যায়ে নিয়ে আসা। তৃতীয়ত, নতুন ঋণ ব্যবস্থাপনায় এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে অনিয়মের সুযোগ থাকবে না এবং ভালো গ্রাহক দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সেবা পাবেন। আমি চাই জনতা ব্যাংক আস্থা, সুশাসন, দক্ষতা ও সেবার মানের দিক থেকেও দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি হয়ে উঠুক।
আমাদের লক্ষ্য হবে-জনতার ব্যাংক হিসেবে জনতার আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
এসএইচ