বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক অভিনব আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন কমিটির সদস্যদের বয়স নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নেটিজেনদের একাংশ। রসিকতা করে কেউ কেউ তাদের ‘সিনিয়র সিটিজেন’ বলেও ডাকছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সমালোচনার ভিড়ে মূল প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে- প্রবীণ ঘরানার এই নেতারা কি আসলেই সমসাময়িক যুবসমাজের মনস্তত্ত্ব বা ‘পালস’ বুঝতে পারবেন?
নেটিজেনদের এই সংশয় ও অভিযোগের যৌক্তিকতা খুঁজতে প্রথমেই নজর দেওয়া যাক শীর্ষ নেতাদের বয়সের দিকে। বৃহস্পতিবার বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ করা হয়। কমিটিতে সভাপতি হিসেবে আছেন আবদুল মোনায়েম মুন্না এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন। অন্যদিকে, রাজনীতির মাঠে পরিচিত মুখ রবিউল ইসলাম নয়নকে করা হয়েছে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়নের বর্তমান বয়স ৫৪ বছর, যিনি ১৯৮৭ সালে এসএসসি পাস করেছিলেন। সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্নার বয়সের সুনির্দিষ্ট তথ্য বিজ্ঞপ্তিতে না থাকলেও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তিনি সাধারণ সম্পাদকের চেয়েও বছর দু-তিনেকের বড় হতে পারেন। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, তিনি ১৯৮৫ সালেই আবুজর গিফারি কলেজ ছাত্রদলের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে এই দুজনের তুলনায় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়ন বয়সের দিক থেকে অনেকটাই তরুণ, যিনি ২০২৩ সাল পর্যন্ত সরাসরি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আদনান রহমান নামের একজন ব্যবহারকারী দেশের প্রচলিত যুবনীতির প্রসঙ্গ টেনে লিখেছেন, বাংলাদেশে জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী যুবকদের বয়সসীমা ১৮ থেকে ৩৫ বছর। আবার জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী তা ১৫ থেকে ২৪ বছর। অথচ যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের বয়স ৩৫ থেকে ৬০ বছর। এমনকি সদ্য সাবেক যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের বয়সও ছিল ৩৮ থেকে ৬৮ বছর। তার এই পোস্টের পর নেটিজেনদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতাদের আসলে বার্ধক্য আসে কোন বয়সে?
অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই সমালোচনাকে কেবল একপেশে হিসেবে দেখছেন না। তাদের মতে, বাংলাদেশ যুবদল কিংবা বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের প্রাথমিক সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো কঠোর বয়সসীমা সুনির্দিষ্ট করা নেই। যুবদলের বর্তমান কমিটির বয়স নিয়ে যারা সমালোচনা করছেন, তারা হয়তো আওয়ামী লীগ আমলের যুবলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বয়স ভুলে যাচ্ছেন। ২০১৯ সালে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির পর যুবলীগের সভাপতি পদ থেকে যখন ওমর ফারুক পদত্যাগ করেন, তখন তার বয়স ছিল ৬০ বছর। এরপর দায়িত্ব নেওয়া শেখ ফজলে শামস পরশের বয়স ছিল ৫০ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন নিখিলের বয়স ছিল ৫৫ বছর। টানা এক দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পরও আওয়ামী লীগ যুবলীগে এর চেয়ে নবীন কাউকে শীর্ষ নেতৃত্বে আনতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করে, বিএনপি সুদীর্ঘ ১৭ বছর রাজনৈতিক অধিকার এবং স্বাভাবিক সাংগঠনিক চর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটি আবার নতুন উদ্যোগে কাজ শুরু করেছে। দীর্ঘ এই সময়ে দলটির একটি বড় অংশের নেতাকর্মীরা কোনো পদ-পদবি পাননি, চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন। ফলে এতদিন পর যখন যুবদলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হচ্ছে, তখন মাঠের পুরোনো ও পোড়খাওয়া নেতাদের মূল্যায়ন করাটা নেতৃত্বের জন্য এক ধরনের বাধ্যবাধকতা ছিল। আর এই কারণেই যুবদলের শীর্ষ নেতৃত্বে এমন কিছু মুখ চলে এসেছে, যাদের বয়স ৫০ ঊর্ধ্ব।
এসএইচ