ইয়েমেনকে দুর্বল রাখার শতবর্ষের সৌদি নীতিই এখন সৌদির নিরাপত্তা ঝুঁকি

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম
ফাইল ছবি

ইয়েমেনকে দুর্বল ও অস্থিতিশীল রাখতে শতাব্দীজুড়ে যেসব নীতি সৌদি আরব চালিয়ে আসছিল, তা এখন উল্টো ফল বয়ে আনছে। রিয়াদের এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের কারণেই মূলত হুথিরা এক শক্তিশালী আঞ্চলিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে, যা এখন খোদ সৌদির নিরাপত্তার জন্যই মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রিয়াদের বিমানবন্দর ও বেসামরিক স্থাপনায় সাম্প্রতিক হুথি হামলায় বিশ্ব অবাক হলেও সৌদি রাজপরিবারের জন্য এটি প্রত্যাশিতই ছিল। কারণ ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীর পেছনে ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদির প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো সংঘাত ও দ্বিপক্ষীয় বিরোধের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে।

সৌদি-ইয়েমেন সম্পর্কের অন্যতম মূল বিরোধের জায়গা হলো সীমান্ত। ১৯৩৪ সালে তায়েফ চুক্তির মাধ্যমে ইয়েমেন সীমান্তের তিনটি প্রদেশ—আসির, নাজরান ও জিজান দখল করে সৌদি আরব। ভৌগোলিক ও সংস্কৃতিগতভাবে ইয়েমেনের কাছাকাছি হলেও এসব অঞ্চল অর্থনৈতিক দিক থেকে সুবিধাবঞ্চিতই রয়ে যায়।

ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা সহজেই চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েন। অন্যদিকে সানার ক্ষমতায় আসা প্রতিটি সরকারই বিভিন্ন সময়ে এসব এলাকা ফেরত চাওয়ার দাবি তুলে এসেছে।

ইয়েমেন সীমান্ত ঘেঁষে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠলে তা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে-এমন আশঙ্কায় কয়েক দশক ধরে ইয়েমেনকে দুর্বল রাখার কৌশল নেয় রিয়াদ। সেখানকার রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও উপজাতীয় বিভেদকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দলকে সামরিক ও আর্থিক সুবিধা দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল রাখা হতো। ১৯৬২ সালে উত্তর ইয়েমেনের রাজতন্ত্রের পতনের পর রিয়াদ উপজাতীয় জোটকে সমর্থন দেয়, আবার পরে দক্ষিণ ইয়েমেনের সমাজতন্ত্রীদের মোকাবিলায় সানার রাজনৈতিক দলকে সাহায্য করে।

১৯৯০ সালে দুই ইয়েমেন এক হওয়ার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থনের অভিযোগে একযোগে ১০ লাখ ইয়েমেনি শ্রমিককে বের করে দেয় সৌদি আরব, যা ইয়েমেনের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।

পরবর্তীতে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভিন্ন ইসলামিক গোষ্ঠীর সংঘাতের ধারাবাহিকতায় হুথি আন্দোলন জোরদার হয়। ২০০৪ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে হুথিদের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের মুখে পড়ে রিয়াদ। ২০১২ সালে আরব বসন্তের মুখে প্রেসিডেন্ট সালেহ ক্ষমতা ছাড়লে সালাফি নেতৃত্বকে সমর্থন দেয় সৌদি, তবে সুসংগঠিত হুথিদের সামনে তারা টেকেনি।

এর ফলে ইয়েমেনে রিয়াদের প্রত্যাশিত দুর্বল প্রতিবেশীর পরিবর্তে এক বিশাল সামরিক শক্তির উত্থান ঘটে, যা এখন লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্যও হুমকি। ইয়েমেনের রাজনীতিকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীল করার কৌশলটিই মূলত ইরানের আইআরজিসির কাজ সহজ করে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিমান হামলা কিংবা মিত্র বাহিনীর তৎপরতায় এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রিয়াদকে ইয়েমেন-সংক্রান্ত পুরো নীতিমালায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সাময়িক যুদ্ধবিরতি অর্জনের পাশাপাশি ইয়েমেনের বাকি অংশে অর্থনৈতিক বিনোয়োগ, জিসিসির সদস্যপদ প্রদান কিংবা সীমান্ত সমস্যা নিয়ে একটি সম্মানজনক রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা জরুরি। একটি বিভক্ত ও অস্থিতিশীল ইয়েমেনের বদলে একটি সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর ইয়েমেন গঠনই কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে পারে।

এসএইচ