ইউরোপ থেকে এশিয়া-বিশ্বের নানা প্রান্তে এখন বেজে উঠেছে তরুণ প্রজন্মের দ্রোহের ঘণ্টা। শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান আর অর্থনৈতিক বৈষম্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে রাস্তায় নেমে আসছে তেরো থেকে উনত্রিশ বছর বয়সী তরুণরা, যা বিশ্বজুড়ে ‘জেন-জি বিক্ষোভ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। দেশভেদে প্রতিবাদের কারণগুলো কিছুটা আলাদা মনে হলেও এর মূল শেকড়টি গাঁথা রয়েছে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি চরম অনাস্থার ভেতর।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকেই ইউরোপজুড়ে আয়বৈষম্য ও সম্পদের অসম বণ্টন প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্রমাবনতি। বছরের পর বছর সরকারি ব্যয় সংকোচনের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জনসেবার পরিধি সংকুচিত হয়েছে। ফলস্বরূপ, বিত্তশালীদের জন্য উন্নত সেবা পাওয়ার পথ খোলা থাকলেও সাধারণ মানুষ এবং নতুন প্রজন্মের তরুণদের কপালে জুটছে বঞ্চনা। আগের প্রজন্মের তুলনায় নিজেদের ভবিষ্যৎ বন্দি দেখতে পেয়েই আজ তারা ফুঁসে উঠেছে।
ফ্রান্সে বিদ্যালয়গুলোর বেহাল দশা এবং অপর্যাপ্ত অর্থায়নের প্রতিবাদে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে রাজপথে। ভারতে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোদি সরকারের কর্তৃত্ববাদী নীতির বিরুদ্ধে দানা বেঁধেছে ‘ককরোচ’ আন্দোলন।
অন্যদিকে স্পেনে আবাসন সংকট এবং উচ্ছেদের শিকার সাধারণ মানুষের চরম দুর্দশা নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। মারিকারমেন নামের এক বৃদ্ধাকে জোরপূর্বক বাড়ি থেকে উচ্ছেদের মর্মান্তিক পরিণতি এবং পরবর্তীতে পার্লামেন্টে সুরক্ষা আইন পাসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনায় সেখানে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।
পরিস্থিতি কেবল এখানেই থেমে নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার তরুণদের কর্মজীবনের প্রবেশদ্বার সংকুচিত করে তুলছে। অভিজ্ঞতাহীন তরুণদের চাকরি পাওয়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও ইতালির রাজধানীগুলোতেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি বৈষম্য এবং টিউশন ফি বাড়ানোর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ রূপ নিয়েছে তীব্র সংঘাতে। মিলান কিংবা ব্রাসেলসের রাজপথে পুলিশের জলকামান ও কাঁদানে গ্যাসের মুখেও থামছে না তরুণদের স্লোগান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল পুলিশি দমনপীড়ন বা কঠোর আইন প্রয়োগ করে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও এর অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলোর সমাধান করা যাবে না। মানসম্মত শিক্ষা, আবাসন ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধান, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এই অসন্তোষ আরও ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। জেন-জি প্রজন্মের এই প্রতিবাদ কেবল তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষোভ নয়, এটি মূলত বৈষম্য ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে এক বৃহত্তর সামাজিক জাগরণ।
এসএইচ