সেনানিবাসে ব্যক্তিগত অস্ত্র বা গানম্যান নেওয়ার বিধান কী?

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ১০:৩৫ এএম

ঢাকা সেনানিবাসের একটি প্রবেশপথে দায়িত্বরত মিলিটারি পুলিশের (এমপি) সঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনের এক প্রার্থীর কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সেনানিবাসে প্রবেশ সংক্রান্ত বিধি-বিধান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশেষ করে বেসামরিক ব্যক্তিরা লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিগত অস্ত্র বহন করে বা সরকারি অনুমোদিত গানম্যান সঙ্গে নিয়ে সেনানিবাসে ঢুকতে পারেন কি না—এই প্রশ্ন সামনে এসেছে। একই সঙ্গে কৌতূহল তৈরি হয়েছে পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালনের সময় নিজেদের অস্ত্রসহ সেনানিবাসে প্রবেশ করতে পারেন কি না, তা নিয়েও।

সেনা আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেনানিবাসে প্রবেশের ক্ষেত্রে দায়িত্বরত মিলিটারি পুলিশের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এমনকি কোনো সামরিক কর্মকর্তা যদি এমপির নির্দেশ অমান্য করেন, সেক্ষেত্রেও তাকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হতে পারে।

তাদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ক্যান্টনমেন্ট আইন, ২০১৮ এবং সেনা সদরের মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরেটের নির্দেশনার আলোকে সেনানিবাস পরিচালিত হয়। আইন অনুযায়ী সেনানিবাস একটি ‘সংরক্ষিত এলাকা’, যেখানে সাধারণ বেসামরিক ব্যক্তির অস্ত্র বা সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এ বিষয়ে বলেন, সেনানিবাস এলাকায় বেসামরিক মানুষের চলাচল ও বসবাস থাকলেও আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব বিষয়ে সেনা আইনই প্রাধান্য পায়। ভূমি বা প্রশাসনিক কোনো বিষয়ে আইনি প্রতিকার চাইলে উচ্চ আদালতে রিট করা যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সেনাবাহিনী চাইলে সামরিক আইনে বিচার করতে পারে, আবার প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনের আওতায়ও হস্তান্তর করতে পারে।

সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে সেনানিবাস, অস্ত্র বহনে কড়াকড়ি

সেনা আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সব সেনানিবাস ক্যান্টনমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষিত। এসব এলাকার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত নির্দেশনা আসে মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরেট থেকে।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার জানান, স্টেশন কমান্ডার ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের গার্ডিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি সরকার মনোনীত একজন নির্বাহী কর্মকর্তা প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকি করেন। তবে নিরাপত্তা বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেয় সেনা সদর।

অস্ত্র বা গানম্যান নিয়ে প্রবেশের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বেসামরিক যে কেউই হোক—সেনানিবাসে অস্ত্র বহন করে প্রবেশের অনুমতি নেই।

এর উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনী দিবসে মন্ত্রী বা ভিআইপিরা সেনানিবাসে গেলেও তাদের গানম্যান ও সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীরা গেটের বাইরে অবস্থান করেন।

পুলিশ, আনসার কিংবা অন্য কোনো সরকারি সংস্থার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। অস্ত্র ছাড়া সেনানিবাসে প্রবেশ করতে হয়।

সেনানিবাসের অভ্যন্তরে যান চলাচল, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকে মিলিটারি পুলিশ। তারা সম্পূর্ণ সামরিক চেইন অব কমান্ডের অধীনে কাজ করে এবং সেনা সদরের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ক্ষমতাপ্রাপ্ত।

পুলিশ যদি তদন্ত বা দাপ্তরিক প্রয়োজনে সেনানিবাসে প্রবেশ করতে চায়, তাহলে আগেই সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। সাধারণত অস্ত্র ছাড়া প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে বিশেষ অভিযানের ক্ষেত্রে সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ভিন্ন সিদ্ধান্ত হতে পারে।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, সেনা সদরের সার্কুলার অনুযায়ী মিলিটারি পুলিশ দায়িত্ব পালন করে। এমনকি সেনাপ্রধান অন্য বাহিনীর সদর দপ্তরে গেলেও তার সঙ্গে থাকা সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীরা গেটেই অপেক্ষা করেন—এটাই প্রচলিত নিয়ম।

তিনি বলেন, মন্ত্রী বা উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির সঙ্গে থাকা পুলিশ ও গানম্যানও সেনানিবাসের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন না। লাইসেন্সধারী ব্যক্তিগত অস্ত্র থাকলেও তা ভেতরে নেওয়ার অনুমতি নেই।

তবে কেউ যদি অস্ত্রসহ সেনানিবাসের ভেতরের রাস্তা ব্যবহার করে অন্য গন্তব্যে যেতে চান, সেক্ষেত্রে আগে থেকেই অস্ত্র ও গোলাবারুদের তথ্যসহ অনুমতির জন্য সংশ্লিষ্ট লগ এরিয়ায় আবেদন করতে হয়। মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবুও সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী গানম্যান গেটেই অবস্থান করবেন।

তিনি আরও বলেন, মিলিটারি পুলিশ প্রয়োজনে যেকোনো সামরিক বা বেসামরিক যান চলাচল সীমিত করতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে তা মানতে হয়। কারণ সেনানিবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব।

এম