ঢাকা: ত্রায়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরই ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। চিঠি পাঠানোর দুই মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নেয়নি নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে দেশের ১১টি সিটি ও ৪২টি জেলা পরিষদে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। স্থানীয় সরকারের পদগুলোতে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ এবং নির্বাচন কমিশনের কোন তৎপরতা না থাকায় ধোয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের মোট ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৩ হাজার ৭৫৫টি নির্বাচন উপযোগী আছে। এ ছাড়া আগামী বছরে আরও ৩৪৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনযোগ্য হবে। অন্যদিকে ভেঙে দেওয়া ৩৩০টি পৌরসভাও এখন নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ত্রায়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর পরই গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আয়োজন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে কমিশনকে চিঠি দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো পৃথক দুই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালের ২ জুন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুযায়ী গত বছরের ১ জুন এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। আর ২০২০ সালের ৩ জুন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ জুন। এছাড়া ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়; সে হিসেবে এ সিটির মেয়াদ শেষ হয় গত ২২ ফেব্রুয়ারি।
স্থানীয় সরকার বিভাগের এই চিঠির পরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে থাকে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে দেশের ১১টি সিটি ও ৪২টি জেলা পরিষদে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। ফলে স্থানীয় নির্বাচনের বিষয়ে ধোয়াশার সৃষ্টি হয়। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে শীঘ্রই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়া হবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সে ধরনের কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছেনা।
স্থানীয় সরকার সংশ্লিষ্টরা বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এরপর সংস্কারের বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ না থাকায় ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। এই মূহুর্তে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিলে নিজ দলীয় প্রার্থীদের জয়ের সম্ভবনা কমতে পারে। ফলে সরকার এই মূহুর্তে নির্বাচন দিতে চায়না। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু জায়গায় প্রশাসক বসানো হয়েছে। এরপর দল গুছিয়ে চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়া হতে পারে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের এই পদগুলোতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে নিয়োগ দেওয়া বেআইনি নয়। এই পদগুলোতে থেকে যেহেতু জনগণের জন্য কাজ করতে হয় এজন্য যারা জনগণের সমস্যা বুঝতে পারে তাদেরই থাকা উচিত। এজন্য আমি মনে করে অতিদ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এই পদে কাজের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি ও সেন্টার ফর সিভিল রাইটস এর মহাসচিব ব্যারিষ্টার এএসএম শাহরিয়ার কবির বলেন, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বলে আসছে তারা সংবিধানের বাইরে যাবে না। জাতীয় নির্বাচনের পরপরই বিএনপি মহাসচিব বলেছিল দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়া হবে। কিন্তু এটি না করে এখন স্থানীয় সরকারের দলীয় লোকদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সবকিছুতে দলীয়করণের কারণেই জুলাই আন্দোলন হয়েছিল। জুলাই আন্দোলনের কথা মুখে বললেও বিএনপি এটি ধারণ না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবজায়গায় দলীয়করণের মাধ্যমে পুরাতন বন্দেবস্তের দিকে ফিরে যাচ্ছে। দলীয়করণ বন্ধ করে অতিদ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করেন এই আইনজীবি।
স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গণমাধ্যমকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করার জন্য যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তা বিশেষ কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে সংসদে পাঠানো হয়েছে। সংসদ সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে এটি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছেন। শিগগিরই এটি সংসদে উপস্থাপন করে আইন আকারে প্রকাশ করা হবে। সব অধ্যাদেশ আইন হিসেবে কার্যকর হওয়ার পরপরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করা হবে।
পিএস