রাজধানীর পল্লবীতে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে পুরো দেশ। খুনিদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে গতকাল শুক্রবার ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ব্যাপক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গতকাল সন্ধ্যায় মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামীকাল রোববার সকালে ময়নাতদন্ত এবং ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পুলিশের হাতে আসার কথা রয়েছে। রিপোর্ট দুটি পাওয়ামাত্রই ওই দিন বিকেলে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে শিশুটির প্রতি মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে ঢাকা আইনজীবী সমিতি ঘোষণা দিয়েছে, প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের পক্ষে সমিতির কোনো আইনজীবী আইনি লড়াইয়ে অংশ নেবেন না।
গত মঙ্গলবার পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই জানালার গ্রিল ভেঙে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও ওই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার আগে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্নাকে। গত বুধবার সোহেল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বর্তমানে তারা দুজনেই কারাগারে রয়েছে।
গতকাল দুপুর থেকেই মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে শিশু হত্যার বিচার দাবিতে বিভিন্ন ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ ছাত্র-জনতা জড়ো হতে থাকেন। বিকেলে পল্লবী থানার সামনেও পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটলেও অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় এই নৃশংসতা থামছে না। সন্ধ্যার দিকে মিরপুর গোলচত্বর থেকে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে তারা অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ লাঠিপেটা ও টিয়ার শেল ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করে।
গতকাল মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে নিহত শিশুটির কুলখানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অংশ নিয়ে শিশুটির বাবা সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ডেকে নিয়ে সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। একজন অভিভাবক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর এই ভালোবাসায় তিনি শতভাগ আশাবাদী যে তার সন্তান হত্যার বিচার পাবেন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানিয়েছে, প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা একজন পেশাদার অপরাধী। তার অতীত রেকর্ড অত্যন্ত খারাপ। পাবনার চাটমোহর থানায় তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা রয়েছে।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার বাসিন্দা সোহেল এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী ও চোর হিসেবে পরিচিত। সেখানে তার বিরুদ্ধে সরকারি ব্রিজের রড চুরির মামলা রয়েছে। চার বছর আগে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর সে এলাকা ছাড়ে এবং দুই বছর আগে স্বপ্নাকে বিয়ে করে।
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে খেলাঘর আসর, গুলশানে গুলশান সোসাইটি এবং খিলগাঁওয়ে পল্লীমা সংসদসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন মানববন্ধন করেছে। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, এখন বাসা থেকে বের হয়ে স্কুলে যেতে বা ফিরতে ভয় লাগে। আমরা মেয়েরা মুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ চাই।
ঢাকার বাইরেও রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সাভার, পাবনা, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দিনাজপুরে এক অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যারা শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুনের সঙ্গে জড়িত, তাদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
এসএইচ