ঢাকা: দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ৪ হাজার ৬৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ‘মোংলা বন্দরের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) মোংলা বন্দরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একইসাথে দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন গতি সঞ্চার হবে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ (এমপিএ) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিআরসিসি)-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) প্রকল্পটির ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন (ইপিসি) ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে চীন সরকার এক্সিম ব্যাংক অব চায়নার মাধ্যমে প্রায় ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সফট লোন সহায়তা প্রদান করছে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং সেতু বিভাগ প্রতিমন্ত্রী মোঃ রাজিব আহসান, নৌপরিবহন সচিব মোঃ আতাউর রহমান খান, এনডিসিসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের প্রতিনিধি, সিআরসিসি ও সিসিইসিসির প্রতিনিধিবৃন্দ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় ৩৬৮ মিটার সম্মিলিত দৈর্ঘ্যের ১০ ও ১১ নম্বর দুটি আধুনিক কনটেইনার জেটি নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নতুন স্থাপনাগুলোর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার টিইইউ (টুয়েন্টি-ফিট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে।
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ৮৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটার আয়তনের লোডেড কনটেইনার ইয়ার্ড, ৩৪ হাজার ১৭০ বর্গমিটার আয়তনের খালি কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ৪ হাজার ২৬০ বর্গমিটার আয়তনের বিপজ্জনক পণ্য হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। এসব অবকাঠামো বন্দরের পণ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও হ্যান্ডলিং কার্যক্রমকে আরো দক্ষ ও গতিশীল করবে।
প্রকল্পটির অর্থায়নের বিষয়ে ২০২৬ সালের ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে চীনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা (সিআইডিসিএ) এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১০ অক্টোবর প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সাথে ২ দশমিক ৪০৪ বিলিয়ন চীনা ইউয়ান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা সমপরিমাণ ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এদিকে, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) চেয়ারম্যান দাই হেগেনের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের চীনা প্রতিনিধিদল আগামীকাল প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করবে। সাক্ষাৎকালে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প বিনিয়োগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সাক্ষাৎকালে ইনভেস্ট বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকবেন। এসময় ইনভেস্ট বাংলাদেশ এবং চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিআরসিসি)-এর মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৃহৎ অবকাঠামো ও শিল্প উন্নয়ন প্রকল্পে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। একইসাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা জোরদার এবং জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নে মোংলা বন্দর আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রস্তাবিত চীনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আধুনিক বন্দর অবকাঠামোর সমন্বয়ে মোংলা ভবিষ্যতে সামুদ্রিক বাণিজ্য, শিল্প বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক লজিস্টিকস কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পিএস