ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশালসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–কে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা বিশ্লেষণ। বিশেষ করে দলের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এবং সহকারী মহাসচিব মুফতি সৈয়দ এসহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের–এর পরাজয় দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটভিত্তি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভরাডুবির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, সাংগঠনিক অদক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের দুর্বলতা। ভোটের দিন বুথ ব্যবস্থাপনা, এজেন্ট সমন্বয়, ভোটারদের কেন্দ্রে আনা—এসব ক্ষেত্রে দলটি বড় রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে ছিল। যেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক নিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিল, সেখানে ইসলামী আন্দোলনের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত।
দ্বিতীয়ত, ইসলামী ভোটের বিভাজন। একাধিক ইসলামী ধারার দল ও প্রার্থীর অংশগ্রহণে ভোট একমুখী হয়নি। কোথাও জামায়াত, কোথাও স্বতন্ত্র বা অন্য জোটের প্রার্থী-ফলে সম্ভাব্য সমর্থনের বড় অংশ ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক ভাষ্যে এটি “এক বাক্সে ভোট না পড়া” সমস্যার প্রতিফলন।
তৃতীয়ত, জোট-রাজনীতির প্রভাব। অতীতে বিভিন্ন সময় ইসলামী ধারার রাজনীতিতে জোটগত সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এবারের নির্বাচনে সেই সমন্বয় কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জামায়াতের জোট রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানো বা ভিন্ন কৌশল নেওয়ার প্রভাবও কিছু আসনে ভোটের সমীকরণ বদলে দিয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
চতুর্থত, আদর্শিক অঙ্গীকার ও বাস্তব রাজনীতির ফারাক। ইসলামী শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার দলটির রাজনৈতিক বক্তব্যে গুরুত্ব পেলেও সাধারণ ভোটারের বড় অংশ এর বাস্তবায়নযোগ্যতা, কাঠামো ও প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পায়নি-এমন মত দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, নীতিগত অবস্থান ব্যাখ্যায় ঘাটতি থাকলে তা ভোটে প্রতিফলিত হয়।
পঞ্চমত, দল সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণার অভাব। অনেক ভোটারের কাছে ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক দর্শন, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা পরিষ্কারভাবে পৌঁছায়নি। ফলে স্থানীয় উন্নয়ন ও প্রার্থীভিত্তিক গ্রহণযোগ্যতা অনেক ক্ষেত্রে প্রতীকভিত্তিক সমর্থনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে দলটির নেতারা বলছেন, এই ফলাফল সাময়িক ধাক্কা মাত্র। তাঁদের দাবি, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার এখনও হাতপাখা প্রতীকের প্রতি আস্থা রেখেছেন। সাংগঠনিক পুনর্গঠন, তৃণমূল শক্তিশালীকরণ ও কৌশল পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও ভালো ফল সম্ভব বলে তারা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনের ফল দেখিয়েছে, কেবল আদর্শিক অবস্থান নয়-কার্যকর সংগঠন, কৌশলগত সমন্বয় এবং ভোট ব্যবস্থাপনায় দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। ইসলামী আন্দোলনের জন্য এটি আত্মসমালোচনা ও পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
এসএইচ