অন্ধকার রাতে রাজধানীর উপকণ্ঠের কোনো এক নির্জন গোরস্তানে ওত পেতে থাকে একদল লাশচোর। দাফন করা নতুন লাশের মাটি সরিয়ে, কাফন ছিঁড়ে বের করে আনা হয় নিথর দেহ। এরপর অ্যাসিড ও রাসায়নিক দিয়ে মাংস গলিয়ে আলাদা করা হয় হাড়। কয়েক হাত বদল হয়ে এই হাড় যখন ধবধবে সাদা কঙ্কাল হিসেবে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে পৌঁছায়, তখন এর দাম দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায়।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও থ্রিডি সিমুলেশনের মাধ্যমে মানবদেহের নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করছে, তখন বাংলাদেশের প্রায় ১০ হাজার নবীন চিকিৎসকের পড়াশোনার হাতেখড়ি হচ্ছে কবর থেকে চুরি হওয়া লাশের হাড় দিয়ে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুগের পর যুগ ধরে চলা এই অমানবিক প্রথা এখন কয়েক কোটি টাকার এক সুসংগঠিত মাফিয়া সিন্ডিকেটে রূপ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশে অ্যানাটমি শিক্ষার জন্য কঙ্কাল সংগ্রহের কোনো বৈধ বা রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া নেই। এই সুযোগে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ চক্র। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মেডিকেল কলেজগুলোয় এই বাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হাতে। তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতারা একে বানিয়েছিলেন কোটি টাকা আয়ের উৎস। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই চক্রের অনেকে আত্মগোপনে গেলেও প্রথাটি থামেনি; কেবল হাতবদল হয়েছে বাণিজ্যের।
চলতি বছরের মার্চে উত্তরা থেকে ৪৭টি মাথার খুলি ও বিপুল হাড় উদ্ধার এবং অতীতে ঢাকা মেডিকেলের কর্মচারীদের জড়িত থাকার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক কতটা দীর্ঘ ও বিস্তৃত। পড়াশোনা শেষে এই হাড়গুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনাও হয় না; অনেক সময় নর্দমা বা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, যা লাশের প্রতি চূড়ান্ত অবমাননা।
শিক্ষার্থীরা জানান, অ্যানাটমি ক্লাস ও পরীক্ষায় ‘আসল হাড়’ সামনে নিয়ে ডেমোনস্ট্রেশন দেওয়ার সনাতন নিয়মের কারণে তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও চড়া দামে এই কঙ্কাল কিনতে বাধ্য হন। অথচ উন্নত দেশগুলোতে এখন ৯৬ থেকে ৯৯ শতাংশ নির্ভুল প্লাস্টিক কঙ্কাল মডেল কিংবা কমপ্লিট অ্যানাটমির মতো থ্রিডি অ্যাপ ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে একটি চুরিকৃত কঙ্কালের পেছনে শিক্ষার্থীদের ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে, সেখানে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহারের বার্ষিক খরচ মাত্র ছয় থেকে আট হাজার টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও প্লাস্টিক মডেল ও স্টিমুলেশন অ্যাপই এখন শিক্ষার প্রধান মাধ্যম।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শেখ মোহাম্মদ ইরফান বলেন, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য স্বাভাবিক উপায়ে কঙ্কাল সংগ্রহ করা অসম্ভব। এর সমাধান লুকিয়ে আছে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে। প্রতিটি মেডিকেল কলেজ যদি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৪-৫টি করে কঙ্কালের সেট বা ‘বোনস ব্যাংক’ রাখে, তবে তা দিয়ে অনায়াসে ১০-১৫ বছর চালানো সম্ভব। শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত পড়াশোনার জন্য প্লাস্টিক বা সিমুলেশন মডেল ব্যবহার করবে এবং ল্যাবে গিয়ে আসল হাড় দেখবে।
চিকিৎসকদের মতে, শুধু গোরস্তান পাহারা দিয়ে লাশ চুরি ঠেকানো যাবে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিএমডিসি যদি মেডিকেল পরীক্ষায় ‘আসল হাড়’ ব্যবহার নিষিদ্ধ করে থ্রিডি স্টিমুলেশন বা প্লাস্টিক মডেল বাধ্যতামূলক ঘোষণা করে, তবেই রাতারাতি বন্ধ হবে লাশ চুরির এই কোটি টাকার অমানবিক মাফিয়া সিন্ডিকেট।
এসএইচ