নাশকতা রোধে রেলে বসছে সিসি ক্যামেরা

  • বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: নভেম্বর ২৯, ২০২১, ০৩:১৯ পিএম

ঢাকা : ভ্রমণরত যাত্রীদের নিরাপত্তা ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ব্যবস্থাসহ বগি কিনছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে দেশের সব রুটেই সিসিটিভিসহ নতুন বগি কেনা হবে বলেও জানা গেছে। অর্থাৎ পর্যায়ক্রমে দেশের সব রেলকোচ সিসিটিভির আওতায় আসবে।

জানা গেছে, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় চীন থেকে ১০০টি ব্রডগেজ বগি কেনা হচ্ছে। এ বগিগুলোতে থাকছে সিসি ক্যামেরা।

সম্প্রতি রেলভবনে এক সভায় বগিগুলোর স্পেসিফেকশন চূড়ান্ত করেছে সংস্থাটি। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণাধীন ঢাকা-যশোর রেলপথসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটে চলবে এসব রেলকোচ।

এর বাইরে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) অর্থায়নে ২০০টি ব্রডগেজ ও টেন্ডারার্স ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ২০০টি মিটারগেজ বগি কিনছে রেলওয়ে। এসব বগিতেও সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা থাকছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

রেলওয়ের মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদার বলেন, পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে চলাচলকারী যে রেলকোচগুলো আনা হবে তার সবগুলোই সিসি ক্যামেরা থাকবে। এগুলো খুব উন্নত প্রযুক্তির। প্রতিটি স্টেশন থেকে তা মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।

এতে করে রেলের নিরাপত্তা, যাত্রীর নিরাপত্তা, অনাকাঙ্খিত কোন ঘটনা ঘটলে তা নিরূপণ সহজ হবে।

মহাপরিচালক আরো বলেন, অনেক রুটেই পুরাতন কোচ রয়েছে। সেগুলোতেও পর্যায়ক্রমে নতুন কোচ দেওয়া হবে। এখন থেকে নতুন কোচ আনলে সেগুলোতে সিসি ক্যামেরাযুক্ত থাকবে।

অর্থাৎ পর্যায়ক্রমে দেশের সকল রুটেই চলাচলকারী কোচকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও রেলে চালানো হয়েছে নাশকতা। আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। সিসি ক্যামেরা যুক্ত হলে নাশকতা চালানো ব্যক্তিকে শনাক্তও করা সম্ভব। পাশাপাশি এর অবস্থান দেখে দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। সর্বোপরি রেলের কোচে সিসি ক্যামেরা থাকার বিষয়টিকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে ১০০টি ব্রডগেজ বগি কেনা হচ্ছে চীনের সিআরইসি তাংশান কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে। এসব কোচের মধ্যে রয়েছে চারটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্লিপার কোচ, ১৬টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেয়ার কোচ, ৫২টি শোভন চেয়ার কোচ, ১৮টি প্যান্ট্রি ও গার্ডব্রেকসহ শোভন চেয়ার কোচ এবং ১০টি পাওয়ার কোচসহ শোভন চেয়ার কোচ।

রেলের কর্মকর্তারা জানান, এ কোচগুলোর প্রতিটিতেই থাকবে সিসি ক্যামেরা। চেয়ারকোচগুলোতে ক্যামেরাগুলো বসানো থাকবে কোচের ভেতরে। আর স্লিপার কোচে ক্যামেরা লাগানো থাকবে কোচের করিডোরে। সম্প্রতি রেল ভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব বিষয় চূড়ান্ত করা হয়েছে।

যাত্রীদের সুবিধার্থে নতুন কোচগুলোতে আধুনিক টয়লেট, ওয়াশিং বেসিন, স্লাইডিং দরজা, টিভি মনিটর, পরিবেশবান্ধব বায়োটয়লেট, শারীরিকভাবে অক্ষম যাত্রীদের জন্য বিশেষ ধরনের টয়লেটসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রাখার কথা জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

রেলওয়ের তথ্য বলছে, ২০১১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩০০টি মিটার গেজ ও ২২০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনা হয়েছে। এসব মিলে বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েতে সচল যাত্রীবাহী কোচ আছে ১ হাজার ৬৭১টি। এর মধ্যে ১ হাজার ২০৩টি মিটারগেজ কোচ। বাকিগুলো ব্রডগেজ। মিটারগেজ ও ব্রডগেজ মিলে বর্তমানে এসি কোচ রয়েছে ২১৬টি। নন-এসি কোচের সংখ্যা ১ হাজার ৪৫৫টি।

রেলের বহরে দেড় হাজারের বেশি কোচ থাকলেও এগুলোর সিংহভাগেরই অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ।

রেলওয়ের সূত্র জানায়, যাত্রীবাহী ১ হাজার ৭৭১টি কোচের মধ্যে ৫৯২টি মিটার গেজ ও ২৬৬টি ব্রডগেজ বগির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। শতাংশের হিসাবে রেলের আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যাওয়া কোচের পরিমাণ ৪৭ ভাগ। প্রায় অর্ধেক কোচের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়ায় ট্রেন পরিচালনা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল জোনের মহাব্যবস্থাপক মিহির কান্তি গুহ বলেন, বর্তমানে রেলের কোচকে ঘিরে যা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তা ইতিবাচক। কোচকে ঘিরে পাথর নিক্ষেপ, কোচের অভ্যন্তরে অনাকাঙ্খিত ঘটনা এবং কোচকে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য সিসি ক্যামেরা যুক্ত আমাদের অনেক কাজে দেবে।

তিনি বলেন, প্রাথমিক অবস্থায় পদ্মা সেতু দিয়ে চলাচলকারী নতুন কোচের সঙ্গে থাকবে এ ব্যবস্থা। পর্যায়ক্রমে সব রুটেই দেয়া হবে বলে আমরা জেনেছি।

তবে রেলের রোলিং স্টকের এ অবস্থার জন্য দীর্ঘদিন ধরে রেল খাতের উন্নয়ন না হওয়াকে দায়ী করছেন রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন।

তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের পর থেকেই বলতে গেলে রেলের উন্নয়ন থমকে গেছে। এ সময়ে সড়কপথে যত উন্নতি হয়েছে, রেলে তার ছিঁটেফোঁটাও লাগেনি। ২০১৯ সালে আওয়ামী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর রেলকে আলাদা মন্ত্রণালয় করা হয়েছে। রেলের উন্নয়নে একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত এক দশকে বাংলাদেশ রেলওয়েতে তিন শতাধিক নতুন কোচ কেনা হয়েছে। কোচ কেনার জন্য আরো একাধিক প্রকল্প চলমান আছে।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আজকে যেভাবে রেলের উন্নতি হচ্ছে, তাতে আমরা আশা করি, কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি উন্নত ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই