প্রতি চার সেকেন্ডে প্রাণঘাতী তামাক ও তামাকজনিত রোগে বিশ্বে অন্তত একজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। দিন দিন বাড়ছে তামাকের ব্যবহার। তামাক কোম্পানিগুলোর পাতা নতুন নতুন ফাঁদে আটকা পড়ছে তরুণ প্রজন্ম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর তামাক ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৭০ লাখ মানুষ মারা যান। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশে বছরে প্রায় ২ লাখ মানুষ তামাকের কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ রোববার বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি: তামাক ও নিকোটিন আসক্তি প্রতিরোধ করি’।
উদ্বেগের বিষয় হলো, তামাক কোম্পানিগুলো এখন আর প্রথাগত সিগারেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের মূল লক্ষ্য এখন শিশু-কিশোর ও নতুন প্রজন্ম। ‘কম ক্ষতিকর’, ‘স্মোক-ফ্রি’ বা ‘ধূমপান ছাড়ার সহায়ক’-এমন নানা বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারা নতুন প্রজন্মকে নিকোটিন আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাজারে আনা হচ্ছে ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন প্রজন্মের পণ্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বৈশ্বিক বাজারে বর্তমানে বাবলগাম, চকোলেট, চেরি বা মিন্ট ফ্লেভারের ১৬ হাজারের বেশি সুগন্ধিযুক্ত তামাক ও নিকোটিন পণ্য রয়েছে, যা সহজেই শিশুদের আকর্ষণ করছে। অনেক ই-সিগারেট দেখতে অবিকল ইউএসবি ড্রাইভ, কলম বা খেলনার মতো। বর্তমানে বিশ্বের অন্তত দেড় কোটি কিশোর-কিশোরী নিয়মিত ই-সিগারেট ব্যবহার করছে, যাদের একটি বড় অংশের বয়স ১৩ থেকে ১৫ বছর। টিকটক, ইউটিউব, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে এগুলোর ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিাগরেট ব্যবহারকারী শিশুদের পরবর্তীতে প্রথাগত ধূমপানে জড়ানোর ঝুঁকি তিন গুণ বেশি থাকে।
ই-সিগারেট বা ভেপিংকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে প্রচার করা হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি এবং সিডিসির গবেষণায় এর গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি উঠে এসেছে। এর ব্যবহারে ফুসফুসের জটিলতা, হৃদরোগ, রক্তনালির ক্ষতি, দাঁত ও মাড়ির রোগ, ক্যান্সারের ঝুঁকি, মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা এবং শেখার সক্ষমতা হ্রাসের মতো সমস্যা দেখা দেয়।
বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে আইনি অগ্রগতি হলেও কিছু জায়গায় বড় উদ্বেগ রয়ে গেছে। চলতি বছরে জাতীয় সংসদে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাস হয়েছে। এই আইনে নির্ধারিত ধূমপান এলাকা (ডিএসএ) বাতিল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ করার মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সংশোধনী প্রক্রিয়া থেকে ই-সিগারেট ও ভেপিং নিষিদ্ধের বিধানটি বাদ পড়ায় দেশে এসব পণ্যের বাজার আরও সহজলভ্য হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। ২০২৪ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে তামাকজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা তামাক খাত থেকে আসা রাজস্ব আয়ের প্রায় দ্বিগুণ। টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের হার ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে বিশেষজ্ঞরা কিছু জরুরি পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছেন। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী জানান, তামাক কোম্পানিগুলো পরিকল্পিতভাবে নতুন প্রজন্মকে আসক্ত করতে আধুনিকতা ও স্টাইলের নামে ই-সিগারেট ও ভেপিং ছড়িয়ে দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এসব নতুন নিকোটিন পণ্যকে দ্রুত কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা, প্রয়োজনে নিষিদ্ধ করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর প্রচারণা বন্ধ করা দরকার।
গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়েরও তরুণদের সুরক্ষায় ই-সিগারেট ও ভেপিংসহ সব নতুন তামাকপণ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম কার্যকরভাবে বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসএইচ