• ঢাকা
  • সোমবার, ০৬ জুলাই, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

পদ্মার চরে বাদাম চাষে বদলে গেল কৃষকের চিত্র


আলমাস আলী, ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি জুলাই ৬, ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
পদ্মার চরে বাদাম চাষে বদলে গেল কৃষকের চিত্র

ছবি : প্রতিনিধি

ঈশ্বরদী: এক সময়ের খরস্রোতা পদ্মা নদী এখন নাব্যতা হারিয়ে মরুভূমির বালুচরে রূপ নিয়েছে। চারিদিকে রূপ নিয়েছে বালুযুক্ত মাটি জমে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ বালুর চর। এমন এক সময় ছিল বালিতে আবাদ হতো না। এখন সেই বালুকে হার মানিয়ে কৃষকের হাতের ছোঁয়ায় সোনালি চিনাবাদাম চাষ করে বদলে গেছে কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থা।

যতদূর চোখ যায় মাঠের পর মাঠ, সবুজ বাদামের ক্ষেত। পাবনার ঈশ্বরদীর পদ্মায় পানি বৃদ্ধির আশঙ্কায় চরে এখন শেষ সময়ের বাদাম তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নদী পাড়ের স্থানীয় বাদাম চাষিরা।

খরচ কম, অধিক উৎপাদন এবং বাজার মূল্য ভালো থাকায় চরাঞ্চলের বাদাম চাষীরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। ফলে দিনে দিনে চরে বাদাম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন পদ্মা পাড়ের  কৃষকরা। এখানকার বাদাম চাষিরা বলছেন, ঈশ্বরদীর পদ্মার চরে এবার চিনাবাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে। চরের উর্বর বেলে-দোআঁশ ও পলিমাটি বাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নামমাত্র খরচ এবং সার-কীটনাশক ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে চমৎকার ফলন পাওয়ায় এবং বাজারে ভালো দাম থাকায় স্থানীয় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে।

সরেজমিনে পদ্মার চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা গেল উপজেলার বিস্তীর্ণ বালুচর জুড়ে সবুজ বাদামের ক্ষেত। এ চরে এবার ব্যাপক আকারে চিনাবাদাম চাষ হয়েছে। কেউ জমি থেকে বাদাম তুলছেন, কেউ জমি থেকে তোলা বাদাম বাড়িতে নিয়ে গাছ থেকে বাদাম আলাদা করছেন, কৃষানিরা ক্ষেত থেকে আনা কাঁচা বাদাম রৌদ্রে শুকাচ্ছেন।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সাঁড়া, পাকশী, লক্ষীকুন্ডা  ইউনিয়নের পদ্মা নদীর চরে পাঁচটি কৃষি ব্লকের প্রায় ১৯০ হেক্টর জমিতে এবার চিনা বাদামের চাষ হয়েছে। চাষীরা ঢাকা -১ এবং বিনা চিনাবাদাম-৬ ও বিনা- ৭ জাতের বাদাম আবাদ করেছেন। প্রতি হেক্টরে জমিতে গড়ে প্রায় ২ দশমিক ১ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে।

ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়া ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের বাদাম চাষী চাঁদু ফকির জানান, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে চিনাবাদাম চাষ করেন। গতবছরের থেকে এবার বাদামের ফলন বেশি। বাদাম চাষ লাভজনক ফসল। তিনি বলেন, সরকার থেকে দেওয়া বাদাম বিজে ফলন কম হওয়ায় এখানকার চাষীরা সরকার থেকে পাওয়া বাদাম বিজ ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করে বাজার থেকে কেজি ২২৫ টাকা দরে নতুন বাদাম কিনে আবাদ করে। কারণ সরকার থেকে পাওয়া বাদাম বীজ অপেক্ষা বাজার থেকে কেনা বিজে ফলন বেশি। তিনি বলেন, সরকার থেকে পাওয়া ১০ কেজি বাদাম টেস্ট করার জন্য আবাদ করি। তাতে ফলনও কম, স্বাদও কম। তিনি বলেন, চরের জমি থেকে বাদাম উঠিয়ে বাড়িতে আনতে ১০/ ১২ টা লোক ( শ্রমিক ) লাগে। তারপরও ফলন ভালো, বাজারদর ভালো থাকায় বাদাম আবাদে তিনি লাভের মুখ দেখছেন।

চরে বাদাম উঠাচ্ছেন উপজেলার সাঁড়া ইউনিয়নের সেকেরচক গ্রামের বাদাম চাষী একরাম খাঁ নামে আরেক কৃষক  জানান, পদ্মার বালুচরে অন্য ফসল তেমন ভালো হয় না। কিন্তু চিনাবাদাম অল্প খরচে খুব ভালো হয়। সার, কীটনাশক কিংবা সেচের তেমন প্রয়োজন হয় না। এবার তিনি ২০ বিঘা জমিতে বাদামের আবাদ করেছেন। বাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে। আবার দামও ভালো। প্রতি মন বাদাম ৪৬০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত ফলন পেয়েছি। এতে তারা লাভবান হচ্ছেন। এ চরে বাদাম চাষে এখন অনেক কৃষক আসছেন।

জমি থেকে বাদাম উঠাচ্ছেন লালপুর উপজেলার সাদিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চাষি মহির উদ্দিন। তিনি বলেন, শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজে কিছু আবাদ করি। কিছু জমিতে বাদাম চাষ করেছি। তিন বছর ধরে বাদামের আবাদ করি। নদীর অপর পাড়ে চরে ছয় বিঘা জমি আছে। এই জমিটা আমার লিজ নেওয়া। এবার মাঝে মাঝে বৃষ্টি, মাঝে রোদ্র থাকায় ওয়েদারটা বাদাম চাষের পক্ষে ছিল। ফলে বিগত বছরগুলোর চাইতে এবার বাদামের ফলন ভালো হয়েছে।

তার পাশে ষাটঊর্ধ্ব উপজেলার গোপালপুর গ্রামের বিধবা ফজিলা খাতুন বাদামের গাছ থেকে বাদাম ও গাছ পৃথক করছেন। তিনি বলেন, ক্ষেতের জমি থেকে বাদাম গাছ উঠিয়ে গোড়া থেকে বাদাম পৃথক করে বাদাম চাষীকে দিয়ে বাদামের গাছ গরু ছাগলের খাবার জন্য তিনি বাড়ি নিয়ে যান।  তিনি বলেন, এই চরে যতদিন বাদাম উঠানো থাকে ততদিন তিনি গরু ছাগলের খাওয়ানোর জন্য এভাবে বাদাম গাছ নিয়ে যান।

পদ্মার চরে দেখা যায় উপজেলার গোপালপুর গ্রামের আরেক বাদাম চাষি বাসিদুল ইসলাম ডুমনা কাজী ক্ষেত থেকে বাদাম উঠাচ্ছেন। তিনি বলেন, চরের বাদাম ৩ থেকে ৪ মাসের ফসল। বিঘা প্রতি ১০ থেকে ১২ মণ ফলন হয়। চরে ক্ষেত থেকে বাদাম উঠিয়ে বাড়ি নিয়ে যেতে যাতায়াতে খাটনি বেশি হয়। যাতায়াতের খাটনি বেশি হলেও চরের বাদাম আবাদে বিঘায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হলেও এক বিঘা জমিতে ১০ থেকে ১২ মন বাদাম পাওয়া যায়। তার বাজার মূল্য ৪ হাজার টাকা মন হলেও ৪০ থেকে ৪৮ হাজার টাকা বিক্রি হয়। এতে বিঘা প্রতি চাষীর বিশ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা লাভ হয়। তিনি বলেন, সরকারি কোন অনুদান প্রণোদনা পাননি। নিজের খরচেই আবাদ করি। আগে দেশি আবাদ হতো। তাতে ফলন কম হতো। এখন আমরা বারি -৬ ও বারি -৭ আবাদ করি। দেশির চাইতে এটার ফলন বেশি।

চরে দেখা গেল গাছসহ বাদামের গাছ থেকে বটি দিয়ে গোড়া কেটে বাদাম পৃথক করছেন লালপুর উপজেলার ঈশ্বরদী ইউনিয়নের বাঙালপাড়ার এলাকার শ্রমিক রুহুল আমিন। তিনি বলেন, এভাবে গোড়া কাটা পাঁচ ছয় বস্তা কাটা যায়।
চরে দেখা মিলল বাড়িতে খাবার জন্য বাদাম কুড়াতে আসা রমেলা ও ওমেলার সাথে।

সন্ধ্যায় নদী পাড়ে দেখা মিলল দিনভর নদীর চরে বাদামের গাছ থেকে ঘোড়া কেটে বাড়ি ফিরছেন শ্রমিক সকিনা। তিনি বলেন, দিনভর ১০ টাকা কেজি হিসাবে এক মন বাদামের গোড়া কেটে ৪০০ টাকা মজুরি পেয়েছেন।

দিনের শেষে  চরের ক্ষেত থেকে সারাদিন বাদাম উঠিয়ে বস্তায় ভর্তি করে সন্ধ্যায় নৌকায় নদীর অপর পারে এসে নৌকা থেকে বস্তা মাথায় নিয়ে পাড়ে আনছেন উপজেলার গোপালপুর গ্রামের বাদাম চাষী মাহাবুল প্রামানিক। এ সময় তিনি বলেন, এবার ফলন ভালো। চরের ক্ষেত থেকে বাদাম ভর্তি বস্তা মাথায় করে নদী পাড়ে স্তুপ করতে হয়। তারপর নৌকায় উঠিয়ে পদ্মার শাখা নদী পার করে অপর পাড়ে জমা করতে হয়। তারপর ভ্যানে করে বাড়ি নিয়ে যেতে হয়। এতে প্রতি নৌকা ও ভ্যান ভাড়া ৭০০ টাকা খরচ হয়। বিগত বছরগুলোর চাইতে এবার ফলন বেশি। তিনি জানান, দুই একর জমিতে বাদাম আবাদ করেছেন। সরকারি কোন সহায়তা পাননি। পাশের উপজেলার এসএএও থেকে সরকারি বিজ নিয়ে আবাদ করে সেটার ফলন ভালো হয়নি। বিঘায় পাঁচ সাড়ে পাঁচ মণের বেশি ফলন হয় না। লালপুর বাজার থেকে বারি ৬ বাদাম বিজ কিনে আবাদ করি।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার কৃষিবিদ প্রহল্লাদ কুমার কুন্ডু জানান, ঈশ্বরদী উপজেলাতে পদ্মার চর আছে। চরাঞ্চলে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের চিনাবাদাম চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে ভালো ফলন হওয়ায় আগামী বছর এ অঞ্চলে চিনাবাদামের আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছি।

পিএস

Link copied!