ফাইল ছবি
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় গেল বছরটি ছিল নজিরবিহীন রায়, বিতর্কিত দণ্ডাদেশ ও কাঠামোগত পরিবর্তনের বছর। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশ থেকে শুরু করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, একুশে আগস্ট গ্রেনেড মামলা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক রায়-সব মিলিয়ে বিচারাঙ্গনের প্রতিটি স্তরই ছিল আলোচনার কেন্দ্রে।
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড, ইতিহাসে নজির
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবিলিটির দায়ে দেওয়া এই রায় রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। মামলার অপর আসামি ও রাজসাক্ষী পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল বেঞ্চ গত ১৭ নভেম্বর এ রায় ঘোষণা করেন। একই বছর আদালত অবমাননার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন।
প্লট দুর্নীতির মামলায় পরিবারের সাজা
পূর্বাচল নতুন শহরে প্লট দুর্নীতির একাধিক মামলায় শেখ হাসিনাকে মোট ২৬ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার পৃথক বিশেষ আদালত। তিনটি মামলায় তাঁকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এক মামলায় সজীব ওয়াজেদ জয় এবং আরেক মামলায় সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন গত ২৭ নভেম্বর এ রায় ঘোষণা করেন।
প্লট দুর্নীতির আরেক মামলায় ঢাকার চতুর্থ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক রবিউল আলম গত ১ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দেন। এ মামলায় শেখ রেহানাকে সাত বছর, তাঁর মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিককে দুই বছর এবং সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে এল
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের রায় দেয় সর্বোচ্চ আদালত। গত ২০ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বিভাগ এ রায় দেন। তবে আদালত বলেন, এই রায় কার্যকর হবে আগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে।
২১ আগস্ট গ্রেনেড মামলা ও বিএনপি নেতাদের মুক্তি
বহুল আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সব আসামির খালাসের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। গত ৪ সেপ্টেম্বর ছয় সদস্যের বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করলে ৪৯ আসামিই চূড়ান্তভাবে মুক্ত হন। একই ধারাবাহিকতায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ সব দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে খালাস দেন আপিল বিভাগ। ১৫ জানুয়ারি ঘোষিত এই রায় বিএনপির রাজনীতিতে বড় স্বস্তি এনে দেয়।
জামায়াত ও এটিএম আজহার: রায়ের মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত
এক যুগ পর রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে আসে। ২০১৩ সালে দেওয়া হাইকোর্টের রায় বাতিল করে গত ১ জুন আপিল বিভাগ জামায়াতের পক্ষে রায় দেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের সাজা বাতিল করে তাঁকে খালাস দেন আপিল বিভাগ। ২৭ মে ঘোষিত এই রায়ও ছিল আলোচনার কেন্দ্রে।
বিচার বিভাগে কাঠামোগত পরিবর্তন
আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় সেনা কর্মকর্তাদের বিচার প্রশ্ন তোলে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্তে অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা বিচার বিভাগ আলাদা হওয়ার দেড় যুগ পর একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ছাড়া সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে আসে।
বছর শেষের আগে প্রধান বিচারপতির অবসর
বছর শেষ হওয়ার তিন দিন আগে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসরে যান সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তাঁর নেতৃত্বেই বছরের অধিকাংশ যুগান্তকারী রায় ঘোষণা হয়, যা বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলোচিত থাকবে।
রায় ও পুনর্বিন্যাসে ভরা এই বছরটি প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের বিচারাঙ্গন কেবল আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র নয়-এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা ও রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের অন্যতম প্রধান মঞ্চ।
এসএইচ







































