ছবি: সংগৃহীত
সাভারে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়া আলোচিত ‘সিরিয়াল কিলার’ মশিউর রহমান সম্রাটের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেছে পুলিশ। সাভার মডেল থানার আশপাশে ঘোরাফেরা করা এই ব্যক্তি নিজেকে ‘কিং সম্রাট’ বা মশিউর রহমান খান সম্রাট বলে পরিচয় দিত। তবে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার আসল নাম সবুজ শেখ।
গত রবিবার সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর তার পরিচয় প্রকাশ্যে আসে। মঙ্গলবার সকালে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পুলিশ জানায়, সবুজ শেখ মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা পান্না শেখ। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বড় বোনের নাম শারমিন। তাদের নানাবাড়ি বরিশালে। গ্রামের স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী খালেক শেখ তাদের আত্মীয় এবং এলাকাবাসীর কাছে পরিবারটি ভয়ংকর ও ডাকাত পরিবার হিসেবে পরিচিত ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পরিচয় গোপন করে ভবঘুরে নারীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতেন সবুজ শেখ। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে নারীদের পরিত্যক্ত ভবনের নির্জন স্থানে নিয়ে যেতেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ওই নারীরা অন্য কারও সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ালে কিংবা অন্য কেউ তাদের সঙ্গে সম্পর্ক করলে তিনি তাদের হত্যা করতেন। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিসহ সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তার গ্রামের বাড়িতে পুলিশি টিম পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ ঘটনার তিন–চার দিন আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে আসেন সবুজ শেখ। ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবকের অনৈতিক সম্পর্ক হলে প্রথমে ওই যুবককে ভবনের দোতলায় নিয়ে হত্যা করেন। পরে তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে লাশ কাঁধে করে দোতলার টয়লেটে নিয়ে গিয়ে দুজনের মরদেহ একসঙ্গে আগুনে পুড়িয়ে দেন। পরে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়।
সোমবার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ছয়টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর গত রাতেই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে সিসিটিভি ফুটেজে কাঁধে করে লাশ বহন করতে দেখা তরুণীর পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহত ওই তরুণীর নাম তানিয়া আক্তার। তার বাবা মৃত জসিম। তিনি মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন এবং মায়ের সঙ্গে রাজধানীর উত্তরায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। গত ১ জানুয়ারি থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে। ভাইরাল হওয়া একটি পুরোনো সাক্ষাৎকার দেখে পরিবারের সদস্যরা সাভার মডেল থানায় এসে পরিচয় নিশ্চিত করেন।
সাভার থানা পুলিশ জানায়, ভবঘুরে প্রকৃতির সবুজ শেখ কয়েক বছর ধরে সাভার মডেল থানার সামনে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের আশপাশ, পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও পাকিজা মোড়ে ঘোরাফেরা করতেন এবং রাত কাটাতেন। গ্রেপ্তারের পর তিনি যে নাম, বাবার নাম ও ঠিকানা দিয়েছেন, তার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে ওই এলাকায় ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট, যার নামের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি নিজের পরিচয় দিতেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছয়টি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করলেও খুনের কারণ নিয়ে একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, তিনি বিকৃত রুচির এবং মানসিকভাবে অসুস্থ একজন ব্যক্তি।
এলাকাবাসীর ভাষ্যেও উঠে এসেছে তার অস্বাভাবিক আচরণের কথা। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভবঘুরে হিসেবে এলাকায় ঘোরাফেরা করতেন, প্রায়ই চিৎকার-চেঁচামেচি করতেন এবং কখনো কখনো পুলিশ, র্যাব বা সেনাবাহিনীর পুরোনো পোশাক পরে থাকতেন। আট মাস আগে কাশিমপুর-২ কারাগারেও বন্দি ছিলেন তিনি, সেখানেও তার আচরণ ছিল বেপরোয়া বলে জানিয়েছেন কারামুক্ত একাধিক হাজতি।
পুলিশ জানায়, গত বছরের ৪ জুলাই সাভার মডেল মসজিদের সামনে এক বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার, ২৯ আগস্ট পৌর কমিউনিটি সেন্টারে এক পুরুষের লাশ, ১১ অক্টোবর একই স্থানে এক নারীর লাশ, ১৯ ডিসেম্বর আরও এক পুরুষের লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলে এলাকায় সিসিটিভি ও আলোর ব্যবস্থা করা হয়। সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারি দুটি পোড়া লাশ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে লাশ সরাতে দেখা যায় সবুজ শেখকে। এরপর তাকে আটক করা হয়।
এসএইচ







































