ফাইল ছবি
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে দীর্ঘ দেড় দশকের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে বড় জয় পেতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দেশটির প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী একসময় আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সাফল্য পেলেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি শক্ত ভিত্তি গড়তে পারছে না। দীর্ঘ সময় পর তাঁর সেই আক্ষেপ এবার ঘুঁচতে চলেছে।
সোমবার (৪ মে) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৫টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। বিপরীতে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে আছে মাত্র ৮৪টি আসনে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৪৮টি আসনের ম্যাজিক ফিগার দুপুরের আগেই পার করে ফেলে গেরুয়া শিবির। এর ফলে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিদায় এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার। তবে এবারের নির্বাচনে এই সমীকরণে বড় ধরণের ওলটপালট দেখা গেছে। রাজ্যের ৫৪টি মুসলিম অধ্যুষিত আসনের মধ্যে তৃণমূল গতবারের তুলনায় ১১টি আসন হারিয়েছে। ২০২১ সালে যেখানে তারা ৫২টি আসন পেয়েছিল, এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬টিতে। অন্যদিকে, এই অঞ্চলে গতবার মাত্র ১টি আসন পাওয়া বিজেপি এবার ১২টি আসনে জয় পেতে যাচ্ছে।
নির্বাচনের আগে সবথেকে আলোচিত বিষয় ছিল ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের নাম বাদ দেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত এই কার্যক্রমে প্রায় ১ কোটি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েন। এই সংশোধনীর প্রভাব পড়া ৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপির বড় উত্থান ঘটেছে। গত নির্বাচনে এসব আসনে বিজেপি ২২টি আসন পেলেও এবার তারা ৬৩টিতে এগিয়ে রয়েছে। বিপরীতে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ৭২ থেকে কমে ৩০-এ নেমেছে। এছাড়া মতুয়া সম্প্রদায়ের ১৭ শতাংশ ভোট ব্যাংকও বিজেপি নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তৃণমূলের শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে পরিচিত ৩৮টি আসনের মধ্যে এবার মাত্র ১৬টিতে তারা লিড ধরে রাখতে পেরেছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ১১৯টি আসনের মধ্যে বিজেপি ১০২টিতে এগিয়ে থেকে বড় ব্যবধান গড়ে দিয়েছে। এছাড়া যে আসনগুলোতে জয়ী দল সাধারণত সরকার গঠন করে, সেই 'বেলওয়েদার' আসনগুলোর অধিকাংশেও এবার পদ্ম ফুটেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী শুভেন্দু অধিকারীকে তাঁর নিজের আসন ভবানীপুরে প্রার্থী করা ছিল বিজেপির একটি পরিকল্পিত কৌশল। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল যেভাবে শীলা দীক্ষিতের দুর্গে হানা দিয়েছিলেন, বিজেপিও সেই একই পথে হেঁটেছে। এর ফলে মমতা নিজের আসন রক্ষায় বেশি সময় দিতে বাধ্য হন এবং রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তে নির্বাচনী প্রচারণায় পর্যাপ্ত সময় পাননি।
তৃণমূলের জয়ের বড় কারিগর হিসেবে পরিচিত নারী ভোটারদের মধ্যেও এবার বিভাজন তৈরি হয়েছে। বিজেপি এবার আরজি কর মেডিকেল কলেজের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে প্রধান নির্বাচনী ইস্যু করে তোলে। এমনকি ভুক্তভোগীর মাকে প্রার্থী করে তারা নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আনে। এর পাশাপাশি নারীদের মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা এবং সরকারি চাকরিতে ৩৩ শতাংশ কোটার প্রতিশ্রুতি নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে।
নির্বাচনী প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই বিজেপিকে 'বহিরাগত' এবং বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে বিজেপি এবার সেই কৌশলের পাল্টা জবাব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি মন্দির পরিদর্শন এবং প্রকাশ্যে মাছ বা ঝালমুড়ি খাওয়ার মতো ঘটনাগুলো বাঙালির মনে এই বিশ্বাস তৈরি করতে পেরেছে যে, বিজেপি তাদের খাদ্যাভ্যাস বা ঐতিহ্যে হস্তক্ষেপ করবে না। এই সাংস্কৃতিক সংযোগ স্থাপনও দলটির জয়ের পথে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
এসএইচ







































