সাদা শার্ট আর প্যান্ট পরে যে কিশোর একসময় বরিশাল জিলা স্কুলের বারান্দা মুখর করে রাখতেন, সময়ের পরিক্রমায় সেই মেধাবী শিক্ষার্থীই আজ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বরিশাল জিলা স্কুল ও সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে বইছে উৎসবের আমেজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিনন্দনের জোয়ারে বারবার উঠে আসছে একটি বাক্য আমাদের বরিশালের কৃতি সন্তান আজ জাতীয় সংসদের অভিভাবক।
অনেকে ফেসবুকে লিখেছেন, মেধা, নেতৃত্বগুণ এবং অদম্য দেশপ্রেম থাকলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও একজন মানুষ দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদের জীবনই তার বড় উদাহরণ।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম। শৈশব ও কৈশোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে বরিশালে। তিনি ১৯৫৯ সালে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬১ সালে বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৪ সালে বিএ এবং ১৯৬৫ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর যশোরে কর্মরত অবস্থায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যশোরের জগদীশপুরে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তীতে ভারত থেকে ফিরে কামালপুর, ধলই বিওপি, কানাইঘাট ও সিলেটের এমসি কলেজ এলাকায় সম্মুখ সমরে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করে।
সামরিক জীবন ও রাজনীতির পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। ষাটের দশকে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব । ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত টানা তিন মৌসুম তিনি এই কৃতিত্ব ধরে রাখেন।
ফুটবল মাঠেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও সম্মিলিত বিশ্ববিদ্যালয় দলের অধিনায়ক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। ক্রীড়াক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
বরিশাল জিলা স্কুল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ফয়সাল আহমেদ বলেন,জিলা স্কুলের এই কৃতি সন্তান আমাদের শেকড়কে সম্মানিত করেছেন। তিনি আমাদের স্কুলের গর্ব, বরিশালের অহংকার।
জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ জানান,বরিশাল নগরের ইশ্বরবসু রোড এলাকায় থাকতেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। আমরা একসঙ্গে খেলাধুলা করতাম। তখন থেকেই তিনি মেধাবী শিক্ষার্থী ও ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। সংসদ পরিচালনায় তাঁর শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তা আমরা দেখতে পাব বলে আশা করি।
বরিশাল সরকারি বিএম কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী মেহজাবিন হক বলেন,একজন বিএম কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে খুব গর্বিত মনে হচ্ছে। স্পিকার হিসেবে তাঁর এই যাত্রা আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় স্বপ্ন দেখতে শেখাবে।
বিএম কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিন বলেন,বিএম কলেজ সবসময়ই নেতৃত্ব তৈরির কারখানা। আমাদের কলেজের একজন প্রাক্তন আজ জাতীয় সংসদের স্পিকার এটি আমাদের জন্য বড় গর্ব। তাঁর জীবন আগামী দিনের ছাত্রনেতাদের জন্য সততা ও দেশপ্রেমের বড় শিক্ষা।
উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলে ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের স্পিকার ছিলেন বরিশালের আবদুল ওহাব খান এবং ১৯৬৫ সালে স্পিকার ছিলেন আব্দুল জব্বার খান। তবে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বরিশাল বিভাগ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হলেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম।
বরিশালের সেই সাদা শার্টের মেধাবী কিশোরের সংসদের স্পিকারের আসনে বসা তাই শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয় এটি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের গর্ব, নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন আর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
এম







































