ফাইল ছবি
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে যখন উদ্দীপনা তৈরি হওয়ার কথা, তখন এক নতুন গাণিতিক সমীকরণ ও আশঙ্কায় তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ। সরকারের নীতিগত আলোচনায় মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব থাকলেও এর বিনিময়ে বর্তমানের ৫ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা বাতিল হতে পারে-এমন আভাসে সাধারণ কর্মচারীরা একে দেখছেন ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ হিসেবে। বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই পরিবর্তন অনেকের জন্য স্বস্তির বদলে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
২০১৫ সালের পে-স্কেলের পর দীর্ঘ সময় নতুন কোনো বেতন কাঠামো না আসায় ২০২৩ সালে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনের ৫ শতাংশ (সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা) বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারী এই সুবিধা পাচ্ছেন। নতুন পে-স্কেলে যদি মূল বেতন ৫০ শতাংশ বাড়ে কিন্তু প্রণোদনাটি মূল বেতনের সাথে সমন্বয় না করে সরাসরি বাতিল করা হয়, তবে নিম্ন ধাপের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রকৃত আর্থিক সুবিধা খুব একটা বাড়বে না। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে এই সামান্য বৃদ্ধি কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হলো বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা। সাধারণত মূল বেতন বাড়লে বাড়িভাড়ার হার একই থাকলেও টাকার অংকে তা বাড়ে। কিন্তু বর্তমান আলোচনায় শোনা যাচ্ছে, সরকার ব্যয়ের চাপ কমাতে ভাতার হার পুনর্নির্ধারণ করতে পারে। যদি মূল বেতন ৫০ শতাংশ বাড়ানোর শর্ত হিসেবে প্রণোদনা বাতিল এবং বাড়িভাড়ার শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়, তবে মাস শেষে একজন কর্মচারীর হাতে আসা টাকার পরিমাণ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম হবে। এটিকেই কর্মচারীরা ‘এক হাতে দিয়ে অন্য হাতে নেওয়া’র কৌশল হিসেবে অভিহিত করছেন।
বর্তমান বাজারে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, গত ১০ বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এই অবস্থায় কেবল মূল বেতন ৫০ শতাংশ বাড়ানো এবং প্রণোদনা বাতিলের সিদ্ধান্ত কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে ব্যর্থ হবে। বিশ্লেষণ বলছে, গত এক দশকে টাকার অবমূল্যায়ন ও নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে অন্তত ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি ছাড়া জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা কঠিন।
ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সরকারি কর্মচারী সংগঠন দাবি তুলেছে যে, কোনোভাবেই প্রণোদনা বাতিল করা যাবে না। তাদের দাবি, ৫ শতাংশ প্রণোদনাকে আগে মূল বেতনের সাথে যুক্ত করতে হবে, এরপর তার ওপর ভিত্তি করে নতুন পে-স্কেল নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় কেবল ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির ঘোষণা হবে একটি চতুর হিসাব, যা কর্মচারীদের আর্থিক সংকটে কোনো স্বস্তি দেবে না। দাবি পূরণ না হলে রাজপথে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছেন তারা।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের মূল উদ্দেশ্যই হলো বাজেটের ওপর চাপ কমানো। তবে কর্মচারীদের এই ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’র অভিযোগকে আমলে না নিলে মাঠ পর্যায়ে অসন্তোষ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। অর্থমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে চূড়ান্ত আলোচনার পরেই পরিষ্কার হবে, সরকার কি কেবল সংখ্যার খেলা দেখাবে নাকি সত্যিই কর্মচারীদের হাতে সচ্ছলতার চাবিকাঠি তুলে দেবে। দিনশেষে, নতুন পে-স্কেল যেন কেবল কাগজের হিসাব না হয়ে জীবনযাত্রার বাস্তব প্রতিফলন হয়, সেটিই এখন বড় প্রত্যাশা।
এফআর







































