• ঢাকা
  • রবিবার, ০৫ এপ্রিল, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

কাচ সম্পদের পুনর্ব্যবহারে রিসাইক্লিংয়ে জোর দিতে হবে


আমিনা বেগম জুলাই ২৪, ২০২১, ০২:৫৪ পিএম
কাচ সম্পদের পুনর্ব্যবহারে রিসাইক্লিংয়ে জোর দিতে হবে

ঢাকা : বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বর্জ্য উৎপাদন। মাত্রাতিরিক্ত বর্জ্যের প্রভাব পড়ছে এর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায়। বর্তমানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত হচ্ছে বর্জ্যের  রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার। দৈনন্দিন উৎপাদিত বিভিন্ন বর্জ্যের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো কাচ জাতীয় বর্জ্য, যা পুনর্ব্যবহারযোগ্য।

গৃহস্থালি এবং শিল্পজাত বর্জ্যে এক বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে কাচজাত কঠিন বর্জ্য। শিল্প উদ্দেশ্যে ব্যবহূত কাচ কোয়ার্টজ বালু, সোডা অ্যাশ (প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সোডিয়াম কার্বনেট), চুনাপাথর, পুনর্ব্যবহূত কাচ এবং বিভিন্ন যৌগ যোগ করে তৈরি করা হয়, যা অপচনশীল। এটি অণুজীব দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পচে যায় না ফলে বছরের পর বছর একই পরিবেশে অপরিবর্তিত থাকে, যা পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। কাচ অতি ভঙ্গুর হওয়ায় এর বর্জ্যের পরিমাণও বেশি। বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বে মোট কঠিন বর্জ্যের মধ্যে কাচজাত বর্জ্যের পরিমাণ ৫ শতাংশ।

আমাদের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডে ব্যবহূত অসংখ্য কাচ সামগ্রী অপরিকল্পিত এবং অসচেতনভাবে যত্রতত্র স্থানে ফেলে দেওয়া হয়। যথাযথভাবে এসব অব্যবহূত কাচ পুনরুদ্ধার না করা হলে তা পরিণত হয় বর্জ্যে। অব্যবস্থাপনার ফলে যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পরিবেশে জমা হচ্ছে তা অদূর ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। এসব বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ সমস্যার একটি আদর্শ সমাধান হতে পারে কাচের রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার। পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ বর্জ্য রং ও মানের ভিত্তিতে চূর্ণ করে, চূর্ণকৃত কাচ বা ক্যুলেটকে গলিয়ে ছাঁচে ফেলার মাধ্যমে রিসাইকেল করে প্রয়োজনীয় নতুন কাচদ্রব্য তৈরি করা সম্ভব।

রাসায়নিক ও গাঠনিকভাবে নানাবিধ ধর্মের অধিকারী হওয়ায় শিল্পক্ষেত্রে, গবেষণাগারে, যানবাহনে, অফিস আদালতে, বাসাবাড়িতে এর বহুল ব্যবহার রয়েছে। প্রাকৃতিক স্থিতিশীল পদার্থ যেমন বালু ও চুনাপাথর থেকে কাচ তৈরি হওয়ায় কাচের পাত্রের সাথে রাসায়নিকসামগ্রী কম পরিমাণে মিথস্ক্রিয়া হয় এবং নিরাপদে পুনরায় ব্যবহার করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় রিফিনিয়েবল পানির বোতলের কথা। তাই বর্তমানে রাসায়নিক শিল্পে এবং ওষুধ শিল্পে কাচের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। স্বচ্ছ, বায়ুরোধী, সুলভ কাঁচামাল, নিম্নমূল্য এবং একাধিকবার ব্যবহারযোগ্য হওয়ার কাচ পণ্যসামগ্রীর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, এখন বাংলাদেশে প্রতি বছর কাচের ব্যবহার বাড়ছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে। দেশে এখন প্রায় সরকারি ও বেসরকারি ৯টি কাচ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে নাসির গ্ল­াস ইন্ডাস্ট্রি, পিএইচপি ফ্লোট গ্ল­াস ইন্ডাস্ট্রি, উসমানিয়া গ্ল­াস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেড, এমইবি গ্ল­াস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, দ্য বেঙ্গল গ্ল­াস ওয়ার্কস লিমিটেড অন্যতম। কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় কাচ উৎপাদনের জন্য বিশেষ সিলিকা বালি বাংলাদেশে অপ্রতুল। বাংলাদেশের শেরপুর জেলার বালিজুরীতে, হবিগঞ্জ জেলার তেলিপাড়া ও শাহজিবাজারে, কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় এবং চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলায় কাচবালির মজুত আছে। কিন্তু তার পরিমাণ মাত্র কয়েক মিলিয়ন টন। কাচ পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে কাঁচামালের ব্যবহার হ্রাস করা সম্ভব। পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কাঁচামাল ধারণ করে। আর এই পুনরুদ্ধারকৃত কাচ হতে পারে নতুন কাচের প্রাথমিক উপাদান।

কাচের বোতল এবং পাত্রগুলো ১০০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং বিশুদ্ধতা বা মানের কোনো পরিবর্তন ছাড়াই অবিরাম পুনর্ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি কাচসামগ্রী ল্যান্ডফিলে পাঠানো হলে তা বিশ্লেষিত হতে এক মিলিয়ন বছর সময় নিতে পারে। বিপরীতে, পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে একটি নতুন কাচের পণ্য তৈরি করতে ৩০ দিনেরও কম সময় লাগে। শিল্প খাতে, সমস্ত পুনর্ব্যবহূত কাচের ৮০ শতাংশই নতুন কাচের পাত্রে পরিণত হয়। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য ও পানীয়ের জন্য ব্যবহূত কাচসামগ্রী পুনর্ব্যবহারযোগ্য। উইন্ডোজ, পাইরেক্স, সিরামিক, ক্রিস্টাল ইত্যাদি অন্যান্য কাচের পণ্যগুলো ভিন্নভাবে নির্মিত হয়। যদি তা পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনযোগ্য না হয় তবে ‘সেকেন্ডারি অ্যাপ্লিকেশন’-এর মাধ্যমেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

কাচ পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার হয়। রিসাইক্লিং কাচ নতুন কাচ তৈরি করতে কাঁচামালের ব্যবহার লাঘব করে। পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ হ্রাস হয়। নতুন কাচ তৈরি করার জন্য ২৬০০ থেকে ২৮০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। যার জন্য প্রচুর শক্তি প্রয়োজন এবং এটি গ্রিনহাউজ গ্যাসসহ অনেক শিল্প দূষণ তৈরি করে। কাচ বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন কাচ তৈরি করলে ৪০ শতাংশ তাপ শক্তি এবং দূষণ হ্রাস পায়। প্রতি ১০ শতাংশ ক্যুলেটের জন্য প্রায় ২-৩ শতাংশ শক্তির ব্যবহার হ্রাস পায়। নতুন কাচ উৎপাদনে কাচ বর্জ্য ব্যবহার করায় কার্বন নিঃসরণ ২০ থেকে ৫০ শতাংশের মতো হ্রাস পেয়েছে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহূত ৬ টন পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচের জন্য ১ টন কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপাদন হ্রাস পায়। পুনর্ব্যবহূত কাচের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বায়ু দূষণকে ২০ শতাংশ এবং পানি দূষণকে ৫০ শতাংশ হ্রাস করে। কাচের রিসাইক্লিংয়ের ফলে বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর উপাদানের নির্গমন ৮ শতাংশ, সালফার অক্সাইড নির্গমন ১০ শতাংশ এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমন ৪ শতাংশ হ্রাস পায়। রিসাইক্লিং করার মাধ্যমে ল্যান্ডফিলের বর্জ্যের পরিমাণ কমে যায়, ফলে ল্যান্ডফিলের ধারণ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

সাম্প্রতিক সময়ে সারা পৃথিবীতেই কাচ জাতীয় বর্জ্য রিসাইক্লিয়ের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্ল­াস প্যাকিং ইনস্টিটিউট অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছরে ১০ মিলিয়ন টন কাচ নিষ্পত্তি করা হয়, যার ৩৩ শতাংশ বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য। ২০১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ বিয়ার এবং কোমল পানীয়ের বোতলগুলি পুনর্ব্যবহারের জন্য উদ্ধার করা হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইপিএ অনুসারে, ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ ওয়াইনের বোতল এবং ১৫ শতাংশ খাবার এবং কাচের অন্যান্য জারগুলো পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। মোট কাচের সমস্ত খাবার এবং পানীয়ের পাত্রের ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। অপরদিকে, চীন, জাপান এবং সুইজারল্যান্ড, জার্মানিসহ অন্যান্য এশীয় ও ইউরোপীয় অঞ্চলে প্রায় ৯০ শতাংশ কাচ রিসাইকেল করা হয়। বিভিন্ন উন্নত দেশসমূহে কাচ রিসাইক্লিং ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে সারা দেশে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার কাচের বাজার আছে। প্রতি বছরই এসব কাচের চাহিদা বাড়ছে। তাই চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে দেশেই এখন কাচ উৎপাদন করা হচ্ছে। আর এই কাচ উৎপাদনের কাঁচামালের সিংহভাগ নির্ভরযোগ্যতা বাড়ছে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ বর্জ্যের। বর্তমানে বাংলাদেশে শহর, বন্দর,‌ পৌর এলাকা এমনকি প্রত্যন্ত এলাকা থেকেও ফেরিওয়ালারা ভাঙা কাচসামগ্রী সংগ্রহ করে রিসাইকেল কেন্দ্রে জোগান দিচ্ছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ তার কাঁচামাল উপাদানগুলোর চেয়ে কম তাপমাত্রায় গলে যায়। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদেরও সংরক্ষণ হচ্ছে। প্রতি টন কাচের রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় ১ দশমিক ২ টনেরও বেশি প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করা যায়। কাচের পুনর্ব্যবহার পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকা নির্বাহে ভূমিকা রাখছে।

বর্জ্য নিয়ে দুটি কথা প্রচলিত আছে। প্রথমটি হলো, আজকের বর্জ্য আগামী দিনের সম্পদ। আর দ্বিতীয়টি হলো, আবর্জনাই নগদ অর্থ। তারই প্রমাণ পাওয়া যায় কাচ জাতীয় বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে। পুনর্ব্যবহার করলে একদিকে বর্জ্য কম তৈরি হবে এবং অন্যদিকে বর্জ্যগুলোকেই আবার ব্যবহার উপযোগী করা যাবে। এতে শুধু পরিবেশের উপকারই হবে না বরং এর দ্বারা অর্থনৈতিক উন্নতি ও বেকারত্ব হ্রাস করা সম্ভব হবে। কাচসামগ্রীর পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশের ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব, সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও অপচয় রোধ করা করা সম্ভব, অর্থ ও জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব এবং উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব। কাচ রিসাইক্লিং সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাই একবিংশ শতাব্দীতে কাচের পুনর্ব্যবহার আরো প্রাসঙ্গিক করতে সরকারের যুগোপযোগী পদক্ষেপ কামনা করি।

লেখক : শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।

Wordbridge School
Link copied!