• ঢাকা
  • সোমবার, ২৭ জুন, ২০২২, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯

শেখ হাসিনার চেষ্টা সফল হয়নি উচ্চশ্রেণীর চাপে


এ কে এম এ হামিদ মে ১৬, ২০২২, ০৪:১৩ পিএম
শেখ হাসিনার চেষ্টা সফল হয়নি উচ্চশ্রেণীর চাপে

ঢাকা: শ্রমজীবী, কর্মজীবী, পেশাজীবীদের মাঝে বেতন বৈষম্য হ্রাসে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পে কমিশনে কয়েক হাজার বেতন ধাপ কমিয়ে ১০টি ধাপে নিয়ে আসেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ঔপনিবেশিক মানসিকতাসম্পন্ন উচ্চক্ষমতাধর ব্যক্তিগণ জাত গেল ধুয়া তুলে আভিজাত্য রক্ষায় ভাগ কর, শাসন কর নীতিতে বেতন স্কেলের ১০টি ধাপকে ২২টি ধাপে রূপান্তর করে। যার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক দর্শনের বিপরীতমুখী যাত্রা। এ ধরনের সামাজিক বৈষম্যমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে শুরু হয় এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানী আজব কারখানায় ফিরিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে একাধিকবার এই বেতন বৈষম্য হ্রাসে পর্যায়ক্রমে ১০টি ধাপে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেও উচ্চ বর্ণবাদীদের চাপের মুখে তা করতে পারেননি। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সরকারী ও সরকারের সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের বেতন স্কেল প্রবর্তন করে আবারও ঔপনিবেশিক আমলের ন্যায় একটি বৈষম্যমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, সংবিধান মতে প্রজাতন্ত্রের সকল স্তরের কর্মচারীকে (সচিব থেকে সহায়ক কর্মচারী) একই আইনের আওতায় এনে গ্রেডভুক্ত কর্মচারী করা হলেও বিভিন্ন সরকারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে আবারও উচ্চশ্রেণী নিম্নশ্রেণী তথা কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা রাজা-প্রজা মনোভাবাপন্ন শ্রেণী বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন করার প্রয়াস চালাচ্ছে এবং তা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কারা জাতির পিতার একক জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার দর্শন বাস্তবায়নে এহেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে? বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও তাদের দোসররা বাঙালী জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে উঠে-পড়ে লেগেছে। কোন এক্সপার্ট সার্ভিস না হলেও সরকারের উর্ধতন কোন কোন ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন বা তাদের সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তি নিজেদের মাসিক বেতন ৬/৭ লাখ টাকা করাসহ ১৫/২০ লাখ টাকার সুযোগ-সুবিধাভোগীরাই ঐসব অপকর্মে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়োজিত। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের সচিব পর্যায়ে ২ লাখ টাকা বেতনের উর্ধতন ব্যক্তিরা কি ঐসব অতি স্মার্টদের চেয়ে কম দক্ষ? নাকি কম কাজ করেন? যদি তা না হয় তাহলে ঐসব চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত ব্যক্তিকে (যাদের চুক্তি শেষে কোন জবাবদিহি করতে হয় না) এত উচ্চ বেতন-ভাতা দিয়ে সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে কেন?

এ কে এম এ হামিদ


 
জাতপাত, শ্রেণী ব্যবধান ও শোষণশাসনের কবর রচনার মহৎ চেতনাকে ধারণ করে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর চির কাক্সিক্ষত স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। যার প্রতিফলন ঘটেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় প্রণীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে। সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগে রাষ্ট্রীয় পরিচালনার মূলনীতিতে স্পষ্টতই বলা হয়েছে- ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে।’ অনুরূপভাবে ২০ (১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয়, এবং প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতানুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন।’ সংবিধানের এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রজাতন্ত্রের বাধ্য বাধকতা রয়েছে। সমাজও রাষ্ট্রের বাস্তবতা মূল্যায়নে সংবিধানের অঙ্গীকার কতটা অনুসৃত হচ্ছে সেটি প্রশ্নাতীত। আমরা হরহামেশা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দুর্নীতি-শোষণমুক্ত সাম্যের বাংলাদেশ নির্মাণের কথা শুনি। এক্ষেত্রে আমাদের গলার জোরটা যতটা প্রকম্পিত, বাস্তবে কর্মের জোরটা ততটা নিভুনিভু। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয়ভাবে যে মনস্তাত্ত্বিক জগত গড়ে উঠেছিল সেটি থেকে বের হতে না পারায় সর্বক্ষেত্রে আত্মপ্রতারণার পথে আমরা ধাবিত হচ্ছি। আমাদের বুঝতে হবে, শোষণ ও দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ ও ক্ষয়িষ্ণু ধারণা কখনও হাত ধরে চলতে পারে না। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেশ পরিচালিত হলে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনার গভীরতা পায়। ফলে একক জাতি গড়া বা জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি হয় না। উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার ধাবমান ধারায় এ ধরনের মানসিকতা দেশকে পেছনে টেনে নেবে।

বহুল প্রত্যাশিত সুখী সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ নির্মাণে সর্বপ্রথমেই শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব সর্বাধিক। কেননা, শিক্ষা হলো সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণের অন্যতম হাতিয়ার। এ শিক্ষা অবশ্যই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভরতার পাশাপাশি মানবিক উৎকর্ষ ও সৃজনশীল হতে হবে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর উন্নয়নের নেপথ্যে কারিগরি শিক্ষা সর্বোচ্চ ভূমিকা রেখেছে। এক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশসমূহসহ জাপান, কোরিয়া ও পার্শ্ববর্তী দেশ সিঙ্গাপুর, মালয়েশিার বিষয়টি বিবেচ্য হতে পারে। সেখানে কারিগরি শিক্ষার হার ৫০ থেকে ৭০ ভাগ পর্যন্ত। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে একক জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠায় ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের শিক্ষাদর্শন বিষয়ক দিকনির্দেশনায় বলেছিলেন, ‘আমি চাই আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা।’ আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়ও বিশ্বজুড়ে আধুনিক জ্ঞান ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রবর্তনের তাগিদ সর্বত্র স্বীকৃত। বিষয়টি অনুধাবনে নিয়ে সরকারপ্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিক্ষার মূল¯্রােতধারায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা নিয়েছেন। নির্ধারিত হয়েছে কর্মমুখী শিক্ষা তথা কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী ৫০ ভাগে উন্নীত করা হবে। কিন্তু এরপরও আলোর বাইরে রয়ে গেছে কারিগরি শিক্ষা। সভা-সেমিনার, বক্তৃতা-বিবৃতিতে এ শিক্ষা যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে বাস্তবে সরকারপ্রধানের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অগ্রগতি খুব কম। কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার ২০১৬ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ভেঙ্গে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ করে এবং কারিগরি শিক্ষার নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন, সমন্বয়ের দায়িত্ব এ বিভাগের অধীন কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরে ন্যস্ত করে। কারিগরি শিক্ষাকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে গণ্য করে পৃথক বিভাগ করা সত্ত্বেও কেন এই মূল¯্রােতধারার শিক্ষা জাতির কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না? তাহলে কি প্রতীয়মান হয় যে, দেশপ্রেমবিবর্জিত হোয়াইট কলারধারী কতিপয় ব্যক্তির অনীহা ও ষড়যন্ত্র? টিভিইটি (টেকনিক্যাল এ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন এ্যান্ড ট্রেনিং) সেক্টরের অগ্রগতি ব্যাহত করে জাতিকে দরিদ্রতায় আটকে রেখে এটা দেশকে আবারও আজব কারখানায় রূপান্তরের চক্রান্ত কিনা?

পলিটেকনিকগুলোতে প্রকট শিক্ষক সঙ্কট বিদ্যমান। ৮০’র দশক থেকে অনেকবার প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে সঙ্কট সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। সে কারণেই প্রায় ৬০/৭০ শতাংশ শিক্ষক উন্নয়ন খাতভুক্ত করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যাদেরকে পরবর্তীতে নিয়মিত করা হয়েছে। দেশের ৪৯টি পলিটেকনিকে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষক স্বল্পতা নিরসনে ২০১০ সালের জুলাই মাসে স্কিলস এ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট প্রকল্পে দুই ধাপে ১০১৫ জনকে সরকারী নিয়ম মেনে নিয়োগ প্রদান করা হয়। প্রকল্পটি ৩০ জুন ২০১৯ সমাপ্ত হওয়ার পরও পলিটেকনিক শিক্ষা ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার স্বার্থে সরকার তাদের চাকরি অব্যাহত রাখে। এ প্রকল্পে বর্তমানে ৭৭৭ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি, লিখিত, মৌখিক, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুলিশ ভেরিফিকেশন, মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ সকল পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়, যাদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানও রয়েছেন। নিয়োগপ্রাপ্তির পর বিগত ১০/১১ বছরের দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই শিক্ষকগণ জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকারপ্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্প শেষে চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের প্রস্তাবনা গত ২২ মে, ২০১৯ তারিখে অনুমোদন করেন।
 
কিন্তু প্রশাসনে লুকিয়ে থাকা স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে দীর্ঘ ২ বছর ৭ মাস অতিক্রান্ত হলেও এসব শিক্ষককে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা হয়নি। বর্তমানে তারা ১৯ মাস ধরে বেতন-ভাতা না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। এ ধরনের অমানবিক জীবনযাত্রার উত্তরণে সরকারপ্রধানের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দাবিতে কর্মরত শিক্ষকগণ ইতোমধ্যে সংবাদ সম্মেলন, জাতীয় প্রেসক্লাবে মানববন্ধন, প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সচিব, মহাপরিচালক বরাবরে স্মারকলিপি প্রেরণ করে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সকল মানবিক আবেদন-নিবেদনের পরও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনানুযায়ী শিক্ষকদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর না হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে শীত, প্রখর রৌদ্র, বৃষ্টি উপেক্ষা করে গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচী ও আমরণ অনশন কর্মসূচী পালন করছেন। কিন্তু এসব শিক্ষকের এই নিদারুণ দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব বা রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ পাশে এসে দাঁড়াননি। প্রশ্ন এসে যায়, মনু প্রবর্তিত উঁচু-নিচু শ্রেণী বিভক্ত ঔপনিবেশিক ঘৃণ্য মানসিকতায় থেকে আজও কি আমরা মুক্ত হতে পারিনি? বঙ্গবন্ধুর শোষণ-শাসন-বঞ্চনা মুক্তির দর্শনে বিশ্বাসী মানুষের পরিবর্তে আমরা সকলেই কি রাজ রাজ্য প্রজাকূলের মানসিকতায় পুণ্যম্লান হয়ে ধন্য হচ্ছি? তাহলে কি অক্ষরজ্ঞানহীন দার্শনিক লালনের গানের কলি ‘সত্য কাজে কেউ রাজি নয়, সবি দেখি তা না না না’ দর্শনে বিশ্বাসী।’ এটা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি হতে পারে? একইভাবে সমাজসচেতন যে কোন ব্যক্তি প্রশ্ন করতে পারেন, একটি গণতান্ত্রিক সরকারপ্রধানের নির্দেশনা ৩ বছরেও বাস্তবায়ন না করে সরকারকেই কি চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে না? সরকারপ্রধানের জনসার্বভৌমত্বের অস্তিত্ব কি সঙ্কটে ফেলছে না? সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছিলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন না করার অর্থ ভয়ঙ্কর। স্বাধীন বাংলাদেশে এ ধরনের ভয়ঙ্কর কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চলতে পারে না।

অনেকের জানা রয়েছে, সমুদ্রগামী জাহাজে নাবিক হিসেবে যে কোন পদ-পদবীতে কাজে যোগদান করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব প্রদানকারী দেশ থেকে Continuous Discharge Certificate (C.D.C.) নামক একটি সনদ প্রদান করতে হয়। নিয়মানুযায়ী এসএসসি /এইচএসসি পাস যে কোন ব্যক্তি ৬ মাসের কোর্স করেই সিডিসি পেয়ে যোগ্য হলে কাজে যোগ দিতে পারেন। দীর্ঘদিন থেকে যথারীতি এদেশের ডিপ্লোমা মেরিন ইঞ্জিনিয়ারদের এ সনদ প্রদান করা হচ্ছে। ফলে দেশী-বিদেশী জাহাজের ক্যাডেটসহ বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং পদে কর্মরত থেকে দেশের জন্য প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে এনেছেন তারা। কিন্তু বিগত ২০১৬ সাল থেকে নানা টালবাহানায় শিপিং দফতরের উর্ধতন কিছু ব্যক্তি স্বগোত্রীয়দের স্বার্থান্ধতা বা কোন বিদেশী এজেন্ট হিসেবে আমাদের দেশের উক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন প্রকৌশলীদের সিডিসি ইস্যু করছে না। ফলে পূর্বে দেশী/-বিদেশী জাহাজে বাংলাদেশের নাবিকদের সংখ্যা ছিল যেখানে প্রায় ৫০ হাজার, বর্তমানে সেখানে তা নেমে এসেছে ১৪ হাজারে। যার ফলে প্রতিবছর দেশ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে। ফিলিপিন্সের মতো দেশ যখন বিশ্বের প্রায় ৩০% নাবিক সরবরাহ করে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্জন করছে, সেখানে বাংলাদেশী নাবিক বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ০.৮৮% মাত্র।
 
এমনি পরিস্থিতিতে বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রবাসী কল্যাণ ও শিপিং মন্ত্রণালয় ডিজি শিপিং দফতরে পত্র প্রদান করেছে। তারপরও উচ্চবর্ণের কতিপয় কর্তাব্যক্তি কৌলিন্য রক্ষায় বা কোন বিদেশীদের স্বার্থসংরক্ষণে সিডিসি ইস্যুতে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ২০১৭ সাল থেকে তাদের সিডিসি নীতিমালা সহজীকরণের মাধ্যমে সে দেশের ব্যাপক সংখ্যক সমুদ্রগামী নাবিক সরবরাহ করে আন্তর্জাতিক সমুদ্রগামী জাহাজের চাকরির বাজার নিজেদের আয়ত্তে নিয়েছে। যেখানে চীন, ইন্দোনেশিয়া, ইউক্রেন, রাশিয়া, রোমানিয়া, জর্জিয়াসহ অনেক দেশই সিডিসি সহজীকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমুদ্রগামী জাহাজে তাদের নাগরিকদের চাকরির ব্যবস্থা করছে, সেখানে আমাদের দেশের উচ্চশ্রেণীর কর্মকর্তারা বিপরীতমুখী আচরণ করছেন। তাহলে উচ্চবর্ণবাদীরা কি বর্তমান সরকার কর্তৃক জনগণের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে দেশটিকে বেকারত্ব ও নৈরাজ্যের আজব কারখানা সৃষ্টি করতে চায়?

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের ধারাবাহিকতায় গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা অব্যাহত থাকায় দেশে লক্ষ কোটি শিক্ষিত বেকার সৃষ্টি হয়েছে। আর এই চরম বেকারত্বের সুযোগে উচ্চশ্রেণীভুক্ত কর্তা ও ধনিক বেনিয়ারা মিলে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে মানুষ বিক্রির আদি ব্যবসা শুরু করেছে। দেশের বেকার জনগোষ্ঠীকে কোন অস্থায়ী পদে সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার সৎ উদ্দেশ্যে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের অফিস নির্দেশ জারি করেছিল। ঐ সরকারী নির্দেশনার ৩ (১) ধারায় উল্লেখ রয়েছে- সেবা গ্রহণের জন্য কোন পদ সৃষ্টির প্রয়োজন নেই এবং কোন পদের বিপরীতেও এ সেবা ক্রয় করা যাবে না। অথচ এই সরকারী নির্দেশনার সুযোগে ২০ থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত প্রায় সকল নিয়মিত/অনিয়মিত পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেয়া শুরু হয়েছে। কোন বণিকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব লোক নিয়োগ দিয়ে ৮/১০ বছর যাবত বাংলাদেশের বেকার খেটে খাওয়া মানুষদের দিনরাত কাজ করানো হচ্ছে।

এসব কর্মজীবীর শ্রমের বিনিময়ে প্রাপ্ত মজুরির একটি অংশ পছন্দ অনুযায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কমিশন হিসেবে প্রদান করা হচ্ছে। ৩০/৪০ বছর কাজ করলেও এসব দরিদ্র মানুষ কোন চাকরিগত সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হবেন না। কি অমানবিক ব্যবস্থা! আদি যুগে বাজারে যেভাবে মানুষ বিক্রি হতো তারই অন্য একটি রূপ চলমান আউটসোর্স ব্যবস্থা। বিষয়টি নিয়ে দেশের একজন বীর উত্তমখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আলাপ করলে তিনি বলেছিলেন, এটা অত্যন্ত অন্যায় ও অমানবিক। এ ধরনের কার্যক্রমকে তিনি দাস প্রথা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যে দেশে দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু ৫৪ বছরের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন, বঙ্গবন্ধুর সেই দেশে এই দাস প্রথা যারা চালাচ্ছেন তারা কি বাংলাদেশ ও জনগণকে ভালবাসেন? সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ঐসব অতি সুবিধাভোগী লোক কিন্তু কোনক্রমেই তাদের জন্য অথবা স্বগোত্রীয় উচ্চবর্ণের তথা ৯ম থেকে ১ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের আউটসোর্সে নিয়োগ দেন না।

উদ্বেগজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সরকারী, আধাসরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় যখন ধারাবাহিকভাবে ন্যায্যতা উপেক্ষিত, ব্যাপক কর্মক্ষম মানুষ আইনী মারপ্যাঁচে জীবিকার তাগিদে ন্যূনতম কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত, সুপারভিশন লেভেলে জনশক্তির অভাবে সরকারী কর্মকা- সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন কার্যক্রমে সরকারী অর্থের অপচয় হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী উচ্চবর্ণের মানুষগুলো নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে স্বগোত্রীয় উচ্চবর্ণের স্বার্থে মাথাভারি সেটআপ/অর্গানোগ্রাম প্রণয়নে দৌড়ঝাঁপ করছেন, অনেক ক্ষেত্রে সেটি অনুমোদনও পাচ্ছে। এতে রাষ্ট্রের ব্যয়ভার গাণিতিকহারে বৃদ্ধি পেলেও জনগণ ও রাষ্ট্র তেমন সুফল পাচ্ছে না। এটি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্র পরিচালনা দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বঙ্গবন্ধুর আরাধ্য সুখী সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে জাত গেল জাত গেল হীন মানসিকতা থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। সমাজের অধিকারবঞ্চিত দরিদ্র জনগণকে শোষণ, বঞ্চনা ও অবহেলার মানসিকতা পরিহার করা জরুরী। জাতপাত, শ্রেণী বৈষম্য, কৌলিন্য, বর্ণবাদের কোনটিই সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠীকে দাবিয়ে রাখার কৌশলে কাজে আসবে না। কারণ, শোষণ, বৈষম্য ও দাবিয়ে রাখার মানসিকতার মধ্য দিয়ে সমাজ রাষ্ট্রে জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি হয় না। একক জাতীয়তাবোধের অভাব থেকেই এক সময় অধিকারহারা মানুষ অধিকার আদায়ে জেগে ওঠে। ফলে সমাজ রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যে ধারণায় দেশকে এগিয়ে নিতে দিবারাত্রি নিরলস পরিশ্রম করছেন, সেখানে সরকারের কিছু সদস্য ও উচ্চপদে আসীন কতিপয় কর্মকর্তার আভিজাত্য রক্ষায় জাত গেল অজুহাতে মানবসম্পদ সৃষ্টি কর্মসূচী বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিভাজন, বিভক্তি সৃষ্টি ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তরায় সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে- সেটাই গণমানুষের প্রত্যাশা।

লেখক : উন্নয়ন গবেষক ও সভাপতি, আইডিইবি

সূত্র-দৈনিক জনকন্ঠ

সোনালীনিউজ/আইএ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।

Wordbridge School
Sonali IT Pharmacy Managment System