• ঢাকা
  • সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১১ আশ্বিন ১৪২৯

অর্থনীতির চাকায় গতি সঞ্চার করে কোরবানি


এস এম মুকুল জুলাই ৭, ২০২২, ১২:২০ পিএম
অর্থনীতির চাকায় গতি সঞ্চার করে কোরবানি

ঢাকা : আমরা অনেকেই ধারণা করি, কোরবানি কেবল গবাদিপশুর বেচাকেনার অর্থনীতি। আসলে কোরবানি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির চাকায় আরো গতি সঞ্চার করে। কোরবানি হলে যেমন গবাদিপশু ক্রয় করেন কোরবানি দাতারা তেমনি খামারি বা প্রান্তিক কৃষকরা গবাদিপশু বিক্রি করে তাদের প্রয়োজনীয় সওদা করেন। এর সাথে যুক্ত হয় কোরবানিকৃত পশুর মাংস রান্না করার জন্য মসলার বিরাট বাজার। কোরবানির পশুর খাবার, জবাই করার ছুরি-চাকু, মাংস কাটার সরঞ্জামাদি, কোরবানি করা-মাংস কাটা ও বণ্টনের জন্য কর্মীদের আয়-রোজগার, কোরবানি করা পশুর চামড়া ক্রয়-বিক্রয় এসব মিলিয়ে এক বিরাট অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রভাব। দেশের অর্থনীতিতে কোরবানির অবদান অনস্বীকার্য। কেননা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কোরবানি পালন করে এক বিরাট ভূমিকা। কোরবানির আগে ও পরে কোরবানির ঈদকে উপলক্ষ করে হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। আর এই মহা কর্মযজ্ঞকে কেন্দ্র করে লাখো-কোটি মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থান এবং আয়রোজগারের ব্যবস্থা জড়িত।

বড় হচ্ছে ঈদ অর্থনীতির আকার : প্রতিবছরের মতো এবারও ব্যবসায়ীরা আশা করছেন সব মিলিয়ে কোরবানির ঈদ অর্থনীতিতে আর্থিক লেনদেন পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ মানুষের আর্থিক সমৃদ্ধি বাড়ছে। কোরবানির জন্য প্রবাসীরাও দেশে অর্থ পাঠান। যুক্ত হবে ঈদ বোনাস। ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন সব মিলিয়ে টাকার প্রবাহ বেড়ে যাওয়া এবং এবার নির্বাচনের বছরে ঈদ হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি দুই হাজার কোটি টাকা যোগ হতে পারে। সরকারি নিয়ম অনুসারে, প্রতিটি গরু-মহিষের জন্য ৫০০ টাকা, দুম্বা বা ছাগলের জন্য ২০০ টাকা এবং উটের জন্য ৬ হাজার টাকা রাজস্ব দিতে হয়। পশুর হাট ইজারা দিয়ে শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেরই আয় হয় প্রায় ২০ কোটি টাকা। দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে ওঠা খামারগুলোতে কর্মসংস্থান হচ্ছে লক্ষাধিক মানুষের। তাছাড়াও কোরবানির পশু পরিবহন, টোল, বকশিশ, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবারেও লেনদেন হয় কোটি কোটি টাকা। কোরবানি হওয়া ৫৫ লাখ গরুর প্রত্যেকটি চামড়ার মূল্য গড়ে ১ হাজার টাকা ধরলেও এর মূল্য হয় ৫৫০ কোটি টাকা। আবার ৪০ লাখ ছাগলের প্রত্যেকটির চামড়ার মূল্য ১০০ টাকা ধরলেও এ বাবদ হয় ৪০ কোটি টাকা। গরু এবং ছাগলের চামড়া মিলিয়ে এই পুরো টাকা চলে যাচ্ছে সরাসরি গরিবদের হাতে। সেই সঙ্গে লাখো লোকের রুটি-রুজির সম্পর্ক রয়েছে। আরো আছে পশুর হাটে হাসিল আদায় ও আদায়ের কাজে জড়িতদের আয়।

কোরবানির অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা বাড়ছে : কোরবানির মাধ্যমে অর্থের কোনো অপচয় হয় না। প্রতিটি বিষয় মানুষের উপকারে আসে। গরিবের কল্যাণে আসে। এদিক থেকে বিচেনা করলে দেশে যত বেশি কোরবানি হবে, তত বেশি গরুচাষীদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে। তারা গরুর ভালো দাম পাবে। কোরবানির দিন গরিব-দুঃখী সকল মানুষের ঘরে হেলো গরিব মানুষেরা পরিবার নিয়ে কয়েকদিন কোরবানির পশুর মাংস খাওয়ার সুযোগ পায়। গরিব মানুষ সারা বছর গরু লালন পালন করে কোরবানির হাটে নিয়ে আসে। কোরবানির পুরো টাকাটাই গরিবের ঘরে যায়। গরিব মানুষ একসাথে গরুর টাকা পেয়ে তারা তাদের চাহিদা পূরণ করে। গরিবের অর্থনৈতিক চাকা সচল হয়। কোরবানির দিন পরিশ্রমী গরিব মানুষের চাহিদা থাকে অনেক বেশি। তারা সামর্থ্যবান ধনীদের কোরবানির গোশত কেটে দিয়ে নগদ পয়সা উপার্জন করে। উপরন্তু তারা কিছু মাংস পায়। ঈদের দিনে তাদের গোশত খাওয়ার পাশাপাশি একদিকে আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয় অতিরিক্ত মাংস বিক্রি করে বাড়তি কিছু আয়েরও সুযোগ হয়।

কোরবানিকে কেন্দ্র করে বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞ : আমরা জানি কোরবানিকে কেন্দ্র করে পশু জবাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ছুরি-কাঁচি-বঁটি-দা’র ভালো মৌসুমি ব্যবসা হয়। একইসাথে কোরবানির পশুখাদ্য যেমন- ঘাস, খড়, ভূষির মৌসুমি ব্যবসা হয়। আবার কোরবানির পশু জবাইয়ের সময় পাটের চট, বাঁশের চাটাইয়ের কেনাবেচা হয়। এছাড়াও কোরবানির মাংসের জন্য মসলার বিরাট ব্যবসাও হয়ে থাকে। কোরবানির ঈদ মৌসুমে মাংস সংরক্ষণের জন্য রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজের ব্যবসাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারই পাশাপাশি কোরবানির পশু আনা-নেওয়া, বেচাকেনায় সহায়তা এবং জবাই ও মাংস তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমের বিনিময় মূল্যও কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। আরো উল্লেখ করার মতো আয়মূলক খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- পশু বাঁধার রশি, খুঁটি, বাঁশ, সাজ-সজ্জার উপকরণ ইত্যাদি থেকে আয়। পশুর হাটে হাসিল আদায় ও আদায়ের কাজে জড়িতদের আয়। এরপর যদি কোরবানির পশুর হাড়, চর্বি, শিং, দাঁত, লেজের পশম থেকে অনেক টাকাা যোগ হয় অর্থনীতিতে। পশুর ভুঁড়ি খাদ্য হিসেবে কেনাবেচা হয় আবার ভুঁড়ির বর্জ্য উন্নতমানের সার হিসেবে ব্যবহূত হয়। আরো জানা গেছে, পশুর রক্ত মাছের সবচেয়ে উন্নতমানের প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার হিসেবে বিশ্বজুড়ে রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। এসবের আর্থিক মূল্য কম নয়। আরো অনেক অনেক খাত আছে, যেগুলো শুধু বেচাকেনার সাথেই জড়িত। এগুলো যোগ করলে আরো কোটি কোটি টাকার ব্যবসা এর সাথে যোগ হয়। সব মিলিয়ে কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে বিরাট অংকের বহুমাত্রিক লেনদেন যুক্ত হয়ে আমাদের অর্থনীতিকে করছে সমৃদ্ধ এবং গতিময়। অর্থনীতিবিদদের মতে, কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে আরো অধিক গতিশীল করে তোলা সম্ভব প্রত্যেকটি খাত, উপখাতকে হিসাবের আওতায় নিয়ে আসতে পারলে। যার মাধ্যমে আমাদের জিডিপি আরো সমৃদ্ধ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে এবার গরু-মহিষ-ছাগল-ভেড়ার কোনো সংকট নেই। ফলে আমদানিরও প্রয়োজন হবে না। তবে খামারি-ব্যবসায়ীরাও বলছেন, এবার দাম কিছুটা চড়া থাকবে। কারণ গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। খামারি ও পশু ব্যবসায়ীদের মতে, গত ছয় মাস আগে গোখাদ্যের যে দাম ছিল, তা এখন বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এ ছাড়া ঈদ সামনে রেখে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে দাম।

দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণে আগ্রহ বাড়ছে : এটি একটি আশাবাদের খবর। অন্যান্য বছর ট্যাবলেট খাইয়ে, ইনজেকশন পুশ করে যারা গবাদিপশু কোরবানির বাজারে বিক্রি উদ্দেশ্যে মোটাতাজা করেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই এবার দেশীয় পদ্ধতিতে গবাদিপশু মোটাতাজা করেছেন কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য। কৃষক, গৃহস্থ ও খামারিরা কাঁচা ঘাস, ধানের খড়ের পাশাপাশি গরুকে খৈল, কুঁড়া, ভুসি খাওয়াচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন খামারিদের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত খবরে এসব তথ্য জানা গেছে। বিভিন্ন খবর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারের প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রচারণা, নির্দেশনা ও তদারকির ফলে খামারিদের মাঝে এমন সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে দেখা গেছে, গত বছর যারা মোটাতাজাকরণের ট্যাবলেট খাইয়ে গরু নাদুসনুদুস করে হাটে তুলেও দাম পায়নি, তারাই এবার দেশীয় পদ্ধতিতে গরু লালন-পালন করেছেন। খবরে প্রকাশ, কিছু খামারি অধিক লাভের লোভে কোরবানির ঈদের আগে গরুকে ইনজেকশন দিতেন অথবা বড়ি খাওয়াতেন। ফলে অল্পদিনের মধ্যে গরু ফুলে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেত। কিন্তু গত বছর কোরবানির ঈদের হাটে নাদুসনুদুস গরুর প্রতি মানুষের তেমন আগ্রহ ছিলো না। তাই এবার কৃষক, গৃহস্থ ও খামারিরা ইনজেকশন ও ট্যাবলেট ছেড়ে দেশি পদ্ধতিতে খৈল, কুঁড়া, ভুসি খাইয়ে গরু মোটাতাজা করছেন।

খামারমুখী হচ্ছেন সচেতন ক্রেতারা : নিরাপদ পশুর জন্য বিশেষত ঢাকার ক্রেতারা পশু কিনতে খামারমুখী হচ্ছেন। হাটে মানুষের ভিড়ে পশু ঠিকমতো দেখা যায় না। দেখে-বুঝে কোরবানির পশু পছন্দ করার জন্যই আগ্রহীরা খামারের পরিবেশকে অনেক ভালো মনে করছেন। এছাড়াও সেখানে নেই দালালদের দৌরাত্ম্য, প্রতারকদের খপ্পর। তাছাড়া খামারে যখন-তখন পশু কেনা যায়। জেনে, শুনে, বুঝে নিরাপদ পশু কেনার জন্য অনেকে সরাসরি খামারে ছুটছেন। আশার খবর হচ্ছে, ভারতীয় গরু আমদানিতে সীমান্তবর্তী রাজশাহী, যশোর, খুলনা, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৩১টি করিডোরের ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ২৮ লাখ পরিবার সরাসরি গবাদিপশু পালনের সঙ্গে জড়িত। দেশে ৬০ শতাংশ গরু পালন করা হয় কুষ্টিয়া, যশোর, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলায়। সাদা ধবল গরু আর ভুটানের বুট্টি গরুর জন্য খ্যাত মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিমের ধবল গরু বানাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। ভারত ও ভুটানের আবাল-পশ্চিমা সাদা ষাঁড় ও সাদা গাভির বাচ্চা কিনে আনেন মীরকাদিমের খামারিরা। প্রতিটি গরু বড় করতে ও কোরবানির হাটে বিক্রি করার জন্য উপযোগী করে তুলতে ৪-৬ মাস সময় লাগে। ধান-চাল আর তেলের কারখানা থাকার কারণে মীরকাদিমের গরুকে মিনিকেট চালের খুদ, এক নাম্বার খৈল, ভাতের মার, সিদ্ধ ভাত, খেসারির ভূষি, গমের ভূষি, বুটের ভূষি খাওয়ানো হয়। এসব গরুর সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ গনিমিয়ার হাটে। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে খাওয়ায় সুস্বাদু এই গরু কিনতে আসেন রহমতগঞ্জের গনিমিয়ার হাটে।

কোরবানিকেন্দ্রিক চামড়া শিল্প : সারা বছরের হিসাব বাদ দিলেও কেবল কোরবানির ঈদে যে পরিমাণ পশু জবাই করা হয় তার অর্থনৈতিক সুফল বিরাট অংকের। কোরবানিকৃত পশুর চামড়া গরিব-মিসকিন, ইয়াতিমদের হক যা দরিদ্রতা দূরীকরণে বড় একটি সহায়ক আর্থিক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এক হিসাবে দেখা গেছে, গড়ে ২ হাজার টাকা করে ৭০ লাখ গরুর চামড়া থেকে আয় হয় ১৪শ কোটি টাকা। এর সাথে ৮০ লাখ ছাগলের চামড়া গড়ে ২শ টাকা ধরা হলে ১৬০ কোটি টাকা। গড়পড়তা মোট প্রায় ১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা গরিব-অসহায়দের আর্থিক সহায়তার এ এক বিরাট ক্ষেত্র। এই চামড়া শিল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় রপ্তানি আয়ের খাত। পশুর চামড়া থেকে জুতা, ব্যাগসহ অন্যান্য চামড়াজাত পণ্যের বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫ হাজার কোটি ডলারের ব্যবসা পরিচালিত হয়। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশ এ বিশাল বাজারের ১ শতাংশও দখলে নিতে পারলে বিরাট অংকের রপ্তানি আয় করা সম্ভব। চামড়া খাতের উদ্যোক্তা ও লেদার টেকনিশিয়ানদের মতে, বাংলাদেশের গরু ও ছাগলের চামড়ার পুরুত্ব কম হওয়ার কারণে চামড়ার কোমলতা বেশি। তাই বাংলাদেশি পশুর চামড়ার উপরিভাগ খুব মিহি- এ কারণে জুতা তৈরির জন্য বাংলাদেশি পশুর চামড়া খুবই উপযোগী। কোরবানির ওপর ভর করেই সম্প্রসারিত হচ্ছে দেশের চামড়া শিল্প। মোট চামড়ার ৬০ থেকে ৭০ ভাগই সংগৃহীত হয় কোরবানি ঈদে। কোরবানির সময় চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা জড়িত। চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজন হয় বিপুল জনবলের। তখন শ্রমিকরা পান তাদের শ্রমের চড়ামূল্য। দেশের বিভিন্ন স্থানে চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, বাংলাদেশে রপ্তানি খাতে চামড়ার অবস্থান তৃতীয়। জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে ইতালি, নিউজিল্যান্ড, পোল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করা হয়।

চাঙা হয় লবণ শিল্প : লবণ হলো চামড়া সংরক্ষণের অন্যতম উপাদান। কোরবানি উপলক্ষে লবণের ব্যবসাও চাঙা হয়। কোরবানির চামড়া সংরক্ষণে লবণের ব্যবহার অতি আবশ্যিক। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রথম ধাপে কমবেশি ২ লাখ মেট্রিক টন লবণের প্রয়োজন হয়। লবণচাষী ও লবণ ব্যবসার সাথে যারা জড়িতরা এ সময় লবণ ব্যবসার মাধ্যমে ভালো আয় করে থাকেন।

গবাদিপশু উৎপাদনে বিশ্বে ১২তম অবস্থানে বাংলাদেশ : ধারাবাহিকভাবে দেশে গরু-ছাগলের উৎপাদন বাড়ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৪ সালে ভারত সরকার এ দেশে গরু আসা বন্ধ করে দেয় হঠাৎ। এরপর গরু মোটাতাজাকরণে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে আড়াই শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হয় খামারিদের। ওই সুবিধা পেয়ে সারা দেশে অসংখ্য শিক্ষিত বেকার তরুণ গরুর খামার গড়ে তোলেন। জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত খামারির সংখ্যা হচ্ছে ৬ লাখ ৮১ হাজার ৫৩২টি। সারা দেশে গরু-ছাগলের খামার গড়ে উঠেছে প্রায় দেড় লাখ। ফলে গরু-ছাগলের উৎপাদন বাড়ছে। ২০১৮ সালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ঘোষণা দেয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, গবাদিপশু উৎপাদনে বিশ্বে দ্বাদশ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এককভাবে ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। ছাগলের দুধ উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ১ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার পশুর মধ্যে গরু ও মহিষের সংখ্যা ৪৬ লাখ ১১ হাজার ৩৮৩টি। গরু-মহিষের এ সংখ্যার মধ্যে হূষ্টপুষ্ট গবাদিপশু রয়েছে ৪২ লাখ ৪০ হাজার ৪৯৩টি আর গৃহপালিত গবাদিপশুর সংখ্যা ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৯০। ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৭৫ লাখ ১১ হাজার ৫৯৭, যার মধ্যে হূষ্টপুষ্ট ছাগল-ভেড়া রয়েছে ৩৩ লাখ ৪৮ হাজার ৭৪০ আর গৃহপালিত গবাদি ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৪১ লাখ ৬২ হাজার ৮৫৭। এছাড়া উট, দুম্বা ও অন্যান্য পশুর সংখ্যা ১ হাজার ৪০৯টি।

স্মার্ট বাংলাদেশ, স্মার্ট হাট : পবিত্র ঈদুল আজহায় পশুর হাটে নগদ অর্থের লেনদেন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। হাটকে কেন্দ্র করে বেড়ে যায় জাল নোট, ছিনতাই ও বিভিন্ন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড। আসন্ন ঈদুল আজহায় এসব সমস্যা এড়াতে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ স্মার্ট হাট’ পাইলট প্রকল্পটি চালু করতে যাচ্ছে সরকার। প্রকল্পটি পরিচালনায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) যৌথভাবে কাজ করছে।

কোরবানিকেন্দ্রিক নিত্যপণ্যের বাজার : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পবিত্র কোরবানির ঈদে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় আড়াই লাখ টন। প্রতিলিটার ভোজ্যতেলের গড় দর ১০০ টাকা হিসাবে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দুই লাখ টন পেঁয়াজ থেকে ৪০ টাকা গড়ে প্রায় ৮০০ কোটি ও রসুন, আদা, হলুদ, মরিচ বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া গরম মসলা এলাচি, দারুচনি, লবঙ্গ, জিরাসহ অন্যান্য মসলা বিক্রি হয়ে থাকে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য।

পশুর উচ্ছিষ্ট থেকে আয় হাজার কোটি টাকা : কোরবানির গোশত আর চামড়ার পাশাপাশি কোরবানির পশুর হাড়, শিং, অন্ডকোষ, ভুঁড়ি, মূত্রথলি, পিত্তথলি, পাকস্থলী, রক্ত ও চর্বি কোনো কিছুই ফেলনা নয়। পশুর এসব উচ্ছিষ্ট অঙ্গ ওষুধ শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল এবং রপ্তানিযোগ্য হওয়ায় এর বাণিজ্য দাঁড়িয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকায়। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পশুর বর্জ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছে ১৭০ কোটি টাকার বেশি। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলতি বছর এর পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। বেসরকারি হিসেবে এর পরিমাণ প্রায় হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। কোরবানির ঈদে শুধু ঢাকা শহরেই উৎপাদিত হয় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য। কোরবানির বর্জ্য হলো হাড়, শিং, নাড়িভুঁড়ি, পিত্তথলি, মূত্রথলি, রক্ত, চর্বি এবং চামড়ার ওয়েস্টেজ অংশ। এগুলো রপ্তানি করলে হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব শুধু কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে।

দেশীয় পশুতেই হোক কোরবানি : দেশীয় খামারিরা ঈদে পশু বিক্রির সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। এখন তারা পশু বিক্রির সময় গুনছেন। ইতোমধ্যে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের পশুর হাটগুলোয় আসতে শুরু করেছে কোরবানির পশু। এবারও দেশীয় পশুতে কোরবানির চাহিদাও মিটবে বলে আশা করছেন খামারিরা। তাদের চাওয়া, যেন দেশের বাইরে থেকে পশু আমদানি না করা হয়। সরকারের নানামুখী উদ্যোগে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে গরু ও ছাগল উৎপাদনে। গত এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিন লাখ। প্রতি বছরই ভারত থেকে গরু আমদানি কমছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবারের ঈদে কোরবানির পশুও কোনো ঘাটতি হবে না। দেশীয় পশুতেই মিটবে কোরবানির চাহিদা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হিরেশ রঞ্জন ভৌমিক এক বিবৃতিতে বলেছেন, ভারত সরকার বাংলাদেশে গরুর রপ্তানির বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করায় সুফল পাচ্ছেন দেশের ক্ষুদ্র খামারিরা। এর ফলে পশু পালনে বাংলাদেশে সফলতা এসেছে। সরকার এ বিষয়ে নানা সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। অধিদপ্তরের মতে, ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু রপ্তানি কমে যাওয়ায় ও সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করায় গত কয়েক বছরে দেশি পশুপালন বেড়েছে, যার সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে।

লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক
[email protected]

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।

Wordbridge School
Sonali IT Pharmacy Managment System