• ঢাকা
  • সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২১, ৫ মাঘ ১৪২৭

কেয়ামত অতি সন্নিকটে


মহীউদ্দীন আহমদ ডিসেম্বর ৪, ২০২০, ১০:০২ পিএম
কেয়ামত অতি সন্নিকটে

ঢাকা : আল্লাহর বাণীর পথনির্দেশনায় আলোকিত জীবনযাপনের জন্য সবাই আমন্ত্রিত। আল্লাহর কালামসমূহ এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যাতে কারো মনে কোনো সন্দেহ বা প্রশ্ন না থেকে যায়। সরল ও প্রাঞ্জল ভাষাশৈলীর ব্যবহারে সব সমাজের সব বয়সের পাঠকের কাছে কোরআন সহজবোধ্য, স্বচ্ছ ও বিশদ বিবরণ পাঠককে মোহিত করে।

এ লেখাটি বহুল প্রচারে অবদান রাখা ইবাদতের সমতুল্য। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই এগুলো লিখিত। সুতরাং ধর্ম সম্পর্কে যারা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান, তাদের জন্য প্রকৃষ্টতম পন্থা হলো লোকজনকে এ বিষয়ে পড়াশোনা করতে উদ্বুদ্ধ করা।

ইতিহাসের শুরু থেকে মানুষ পর্বতরাজির মহিমা ও আকাশমার্গের বিশালতা উপলব্ধি করে এসেছে। তাদের পর্যবেক্ষণের ধারা ও প্রণালি আদিম ও অর্বাচীন; তাই তারা এদের অবিনশ্বর ভাবত।

কোরআনের উদ্ভাসিত অন্যতম সত্য এই যে, বিশ্বচরাচর পরিকল্পিতভাবে সৃষ্ট এবং একদিন এর অবসান অবশ্যম্ভাবী। সেইসঙ্গে মানবজাতি এবং সমগ্র জীবজগতেরও পরিসমাপ্তি ঘটবে। এই পরিকল্পিত বিশ্ব যা বহুকাল থেকে নিখুঁতভাবে চলে এসেছে, তা একজন স্রষ্টার সৃষ্টি এবং তাঁরই হুকুমে, তাঁরই নির্দেশিত সময়ে এসবই বিনাশপ্রাপ্ত হবে।

যে নির্দিষ্ট ক্ষণে অনন্ত বিশ্ব ও এর জীবকুল-জীবাণু থেকে মানব, তারকালোক ও ছায়াপথ বিলীন হবে, কোরআনে তাকে ‘সময়’ বলা হয়েছে। এই ‘সময়’ কোনো কার্য নির্ঘণ্ট নয়; বরঞ্চ একটি সুনির্দিষ্ট ক্ষণ যখন সমগ্র দুনিয়া নিঃশেষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

অখিল বিশ্বের ধ্বংসপ্রাপ্তির সংবাদের পাশাপাশি কোরআন এ ঘটনার বিস্তৃত বিবরণও প্রদান করে। ‘যখন নভোমণ্ডল বিদীর্ণ হবে’, ‘বিক্ষুব্ধ সমুদ্রেরা যখন একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে’, ‘পর্বতমালা যখন চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে’, ‘সূর্য যখন অন্ধকারে ছেয়ে যাবে’,... সেই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে মানুষের মনে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হবে। বিশেষ জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, সে অবস্থার হাত থেকে কোনো নিষ্কৃতি নেই, পালানোর কোনো পথ নেই। এসব বিবরণ থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে, ক্রান্তিলগ্নের সেই পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ যে, পৃথিবী এর আগে কখনো তেমন অবস্থার মুখোমুখি হয়নি। সেসব ভয়াবহতার বিবরণ কোরআনে পুনরুত্থানের দিন ও মৃত্যু, পুনরুত্থান ও নরকে লিপিবদ্ধ আছে। কেয়ামতের আসন্নকালে যেসব ঘটনা ঘটবে, তা-ই বক্ষ্যমাণ রচনায় কিঞ্চিৎ আলোচনা হলো।

আলোচনার প্রথমেই বলা প্রয়োজন, কোরআনের একাধিক আয়াত থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, অখিল বিশ্বের অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসপ্রাপ্তির বিষয়টি সব যুগের মানুষের মনে ঔৎসুক্যের জন্ম দিয়েছে। কিছু আয়াতে বর্ণনা আছে যে, লোকেরা কেয়ামতের দিনক্ষণ সম্পর্কে মহানবী (সা.)-কে প্রশ্ন করেছে :

তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করবে : কেয়ামত আসার সময় কখন? [সূরা আল আ’রাফ : ১৮৭]

তারা তোমাকে ‘সময়’ সম্পর্কে প্রশ্ন করে : ‘কেয়ামত কখন আসবে?’ [সূরা আল-নাযিয়াত : ৪২]

এসব প্রশ্নের উত্তরদানের জন্য আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে এভাবে নির্দেশ দিলেন :

‘একথা শুধু আমার প্রভুই জানেন...।’ [সূরা আল আ’রাফ : ১৮৭]

অর্থাৎ কেয়ামতের দিনক্ষণ সংক্রান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই এখতিয়ারে। এর থেকে আমরা বুঝি যে, ‘কেয়ামতের’ আগমন সময় মানুষের জ্ঞানের অগম্য।

আল্লাহ কেন ‘কেয়ামতের’ আগমন ক্ষণকে মানুষের জ্ঞানের সীমানার বাইরে রেখেছেন, নিশ্চয়ই তার অন্তর্নিহিত কারণ আছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মানুষ যে কোনো শতাব্দীতেই বাস করুক না কেন, তার জন্য এটা মঙ্গলময় যে, সে ‘...কেয়ামত সম্পর্কে উদ্বিগ্ন থাকে।’ [সূরা আল আম্বিয়া : ৪৯] এবং আল্লাহর মহত্ত্ব ও বিপুল পরাক্রম সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল থাকে। সেদিনের ভয়াবহতা হঠাৎ করে তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলার আগে তাদের জানা উচিত যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া তাদের আর কোনো আশ্রয় নেই। যদি কেয়ামতের সঠিক নির্ঘণ্ট জানা থাকত, তাহলে বর্তমান সময়ের পূর্ববর্তী লোকেরা প্রলয়কাল সম্পর্কে চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করত না। কোরআনে বর্ণিত ক্রান্তিকালীন ঘটনাবলি সম্পর্কে তাদের কোনো আগ্রহ থাকত না।

কিন্তু একথা বলা প্রয়োজন যে, কোরআনের বহু আয়াতে ‘কেয়ামতের’ অমোঘ সত্যতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। ‘কেয়ামতের’ সঠিক সময় সংকেত নেই বটে; কিন্তু তার আনুপূর্বিক ঘটনাসমূহের সম্যক বিবরণ রয়েছে। তেমনি কিছু নিশানার বিবরণ আছে এই আয়াতে :

‘তারা কি আশা করছে যে, কেয়ামত হঠাৎই তাদের ওপর এসে পড়বে? এর লক্ষণসমূহ তো এসেই পড়েছে, এখন তাদের স্মারক দিয়ে কী লাভ?’ [সূরা মোহাম্মদ : ১৮]

এই আয়াত থেকে জানা গেল যে, কোরআন কেয়ামতের আলামতসমূহ আলোচনা করেছে। সেই ‘অবিস্মরণীয় ঘোষণা’ হূদয়ঙ্গম করার জন্য আমাদের প্রাসঙ্গিক আয়াতসমূহ অনুধাবন করা প্রয়োজন। অন্যথায়, কেয়ামত যখন এসেই যাবে, তখন আর এ সম্পর্কে চিন্তা করে কোনো লাভ হবে না।

মহানবী (সা.)-এর কিছু কিছু হাদিসে কেয়ামতের আলামত সম্পর্কে বলা হয়েছে, সেগুলোতে ‘কেয়ামতের’ সময়কালীন ও তার অব্যবহিত পূর্বকালীন অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ সন্নিবদ্ধ আছে। যে সময়েই আলামতগুলো প্রকট হয়ে উঠবে, সেই সময়কে ‘ক্রান্তিকাল’ বলা যায়। ‘ক্রান্তিকাল’ ও কেয়ামতের আলামত ইসলামের ইতিহাসে প্রচুর ঔৎসুক্যের অবতারণা ঘটিয়েছে, বহু ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষকের সৃষ্টিকর্মের প্রেরণার উৎস জুগিয়েছে।

এ ধরনের জ্ঞান-তথ্য সংকলন শেষে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছাই : কোরআনের আয়াত ও রাসূলের হাদিসসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ‘ক্রান্তিকাল’ দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম পর্যায়ে বস্তুতান্ত্রিক ও আধ্যাত্মিক আধিপত্য বিকাশ পাবে; সেই স্বর্ণযুগে সমগ্র মানবজাতি সুখানুভূতিতে আপ্লুত হবে। স্বর্ণযুগের শেষে পৃথিবীময় সামাজিক অবক্ষয় নেমে আসবে। কেয়ামতের আগমন তখন হবে অত্যাসন্ন।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে কেয়ামতের আলামতসমূহের নিরীক্ষা করা এবং সেসব নিশানার সাম্প্রতিক প্রকটময়তা প্রমাণ করা। এসব ১৪শ বছর আগে ব্যক্ত করা হয়েছে, সেই সত্য আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসীদের ভক্তি ও অনুরক্তি গভীরতর করবে। আল্লাহর দেওয়া অঙ্গীকার মনে রেখেই আমাদের চলতে হবে :

‘বল, সকল প্রশংসা আল্লাহর! তিনি তোমাদেরকে তাঁর নিশানাসমূহ দেখাবেন এবং তোমরা সম্যক পরিজ্ঞাত হবে।’ [সূরা আল-নমল : ৯৩]

একটি বিশেষ বিষয়ে সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত : আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা। অন্যান্য বিষয়ের মতো কেয়ামত সম্পর্কে আমরা ততটুকুই জানি, যতটুকু তিনি আমাদের কাছে উন্মোচন করেছেন।

সোনালীনিউজ/এমটিআই