• ঢাকা
  • শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২০, ৯ কার্তিক ১৪২৭
Sonalinews.com

ফখরুলকে বাদ দিয়ে বিএনপির মহাসচিব পদে আলোচনায় ৩ নেতা


নিজস্ব প্রতিবেদক সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০, ০১:০৬ পিএম ফখরুলকে বাদ দিয়ে বিএনপির মহাসচিব পদে আলোচনায় ৩ নেতা

ঢাকা : নির্বাচনের আগে ও পরে আন্দোলনে ব্যর্থ, তৃণমূল থেকে রয়েছেন বহুদূর, সম্পর্ক নেই জোট শরীকদের সঙ্গে, দলের ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তের জন্য তাকিয়ে থাকতে হয় লন্ডন বার্তার দিকে। এত সবকিছুর পর রয়েছে ক্ষমতাসীন নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে কর্মসূচি না দেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ। এসব কিছুকে সামনে রেখে জোড়াল হচ্ছে বিএনপির মহাসচিব পদে নতুন কাউকে আনার মসনদ। দীর্ঘদিন সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত থেকে অতপর মহাসচিব হওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতোমধ্যে পার করে দিয়েছে প্রায় একযুগ। এই সময়ে দলের কোনো উল্লেখ যোগ্য সাফল্য নেই। তাই ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে ফখরুল হটাও আন্দোলন।    

এমতাবস্থায় মহাসচিব পদে এবার আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন তিন নেতা। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যার নাম উচ্চারিত হচ্ছে, তিনি হলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আবার অনেক সিনিয়রকে ডিঙিয়ে স্থায়ী কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নামও আলোচিত হচ্ছে। তিনি তারেক রহমানের বেশ অনুগত বলে প্রচার আছে। সিরাজগঞ্জের রাজনীতিতে প্রভাবশালী এ নেতা বর্তমানে দলের দুটি কমিটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। করোনা পরিস্থিতিতে দলের জাতীয় করোনা পর্যবেক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক এবং পরবর্তী সময়ে বন্যা পরিস্থিতিতে দলের গঠিত ত্রাণ কমিটিরও আহ্বায়ক করা হয়েছে তাকে।

অপরদিকে গুঞ্জন আছে, মহাসচিব পদটি পাওয়ার জন্য স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছেন দলের ‘ফুলটাইম’ রাজনীতিবিদ বলে পরিচিত রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। ১/১১-এর সময় থেকে লাইমলাইটে আসা সাবেক এই ছাত্রদল নেতা কখনোই থেমে থাকেননি। চলছেন তো চলছেনই। মামলা, গ্রেফতার কিংবা করোনা, কোনো কিছুই দমিয়ে রাখতে পারেনি তাকে। যদিও তার এসব বিষয় নিয়ে দলের মধ্যে রয়েছে নানা রকমের রাসাত্মক আলোচনা।

বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও তার ওপর বিরক্ত। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বহুবারই রিজভীকে নিয়ে প্রকাশ্যে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির দফতর সম্পাদকের পদটি খালি থাকায় সেটিও সামলাচ্ছেন রুহুল কবির রিজভী। 

যদিও সমালোচকরা বলেন, রিজভী দফতর সম্পাদকের দায়িত্বে কাউকে আসতে দেননি ইচ্ছা করেই। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তার প্রভাব বলয় সৃষ্টি করতেই তিনি এসব করেছেন। সেদিক থেকে তাকে যদি তারেক রহমান মহাসচিব হিসেবে ঘোষণা দেন তাতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপির সাতজন নেতা মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা হলেন- প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী (১৯৭৮-৮৬), লে. কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান (১৯৮৬-১৯৮৭), কে এম ওবায়দুর রহমান (১৯৮৭-১৯৮৮), ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদার (১৯৮৮-১৯৯৬), আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া (১৯৯৬-২০০৭), খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন (২০০৭-২০১১) এবং বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (২০১১- ২৯ মার্চ ২০১৬ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত এবং ৩০ মার্চ ২০১৬ থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত)।

দলের মহাসচিব পদে পরিবর্তনের আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘এ ধরনের কোনো আলোচনা নেই। যারা এ ধরনের কথা বলছেন, তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ কথা বলছেন।’

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী-ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু-এড. রুহুল কবির রিজভী আহমেদ

আরো যেকারণে ফখরুলকে বাদ দেয়া হতে পারে 

বিএনপিতে মহাসচিব নিয়ে আবার গুঞ্জন শুরু হয়েছে। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরে যেতে চান, তিনি আর দায়িত্ব পালন করতে চান না-এরকম গুঞ্জন রয়েছে। অন্য একটি সূত্র বলছে যে, মহাসচিব বদলের ব্যাপারে বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়া একমত পোষণ করেছেন এবং যেকোন সময় নতুন মহাসচিব নিয়োগ করা হতে পারে।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে গেল ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর থেকেই অস্বস্তি এবং উত্তেজনা শুরু হয়েছিল। সেই সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই সরে যেতে চেয়েছিলেন। তবে তারেক জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি আস্থা রাখেন এবং তারই নির্দেশেই দায়িত্ব পালন করতে থাকেন ফখরুল। দলের নেতাদের কাছে ঐক্যফ্রন্টে যাওয়াটা সঠিক হয়নি এমন মত ফখরুলের। তিনি ড. কামাল হোসেনদের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য আদর্শের পরিপন্থি বলেও উল্লেখ করেছেন। এই প্রেক্ষাপটেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি আসন্ন ঢাকার দুটি সহ পাঁচটি আসনে উপনির্বাচনে একক প্রার্থী দেয় বিএনপি। যাতে শরিকদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। এব্যাপারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ হয় না। আসন্ন উপ-নির্বাচনগুলোতে তারা এককভাবে প্রার্থী দিলেও আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। আমরাও আলাদাভাবে প্রার্থী দেওয়ার চিন্তা ভাবনা করেছি।  

এব্যাপারে ফখরুল বলেন, আমরা নির্বাচনী জোট গঠন করেছি এটা সত্য তবে আমরা একক ভাবে প্রার্থী দিতে পারবো না এই ধরনের কোনো এগ্রিমেন্ট তাদের সঙ্গে করিনি। তাদেরও নির্জস্ব পছন্দ থাকবে এটা স্বাভাবিক। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এসব বক্তব্যগুলোর সঙ্গে একমত পোষণ করেননি দল ও জোটের অনেক নেতা।

বিএনপির একাধিক নেতা জানান, আগেই এই বিষয়টি আলোচনা হয়েছে এবং বেগম জিয়াও ঐক্যফ্রন্টের ব্যাপারে তাঁর নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। এরকম মনোভাব যে প্রকাশিত হয়েছে তা বোঝা যায় এর পরবর্তী পর্যায়ে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বক্তব্যের মধ্যে দিয়েই। ঐক্যফ্রন্টের অনেক নেতাই বিএনপির চেয়ারপারসনের এই বক্তব্যকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। বরং তারা ঐক্যফ্রন্টের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে যেটাই হোক না কেন ঐক্যফ্রন্ট গঠনের ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং খালেদা জিয়ার যেহেতু নেতিবাচক অবস্থান রয়েছে সেহেতু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই সমালোচনার মুখোমুখি পড়তে হয়। এতো সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত যদি ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিএনপি বেরিয়ে যায় তাহলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও মহাসচিবের পদ থেকে সরে যেতে হবে বলে বিএনপির একাধিক নেতা মনে করছেন।

এছাড়াও দলের ভেতরে বাইরে আলোচিত হচ্ছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সরকারের সুসম্পর্ক। বিএনপির একাধিক নেতা বলছেন যে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সরকারের গোপন সম্পর্ক রয়েছে। সরকারের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তাদরে ইঙ্গিতেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোন জোরালো রাজনৈতিক কর্মসূচী দেননি। এমনকি বেগম খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের পরেও তিনি কোনো জোড়ালো কর্মসূচি গ্রহণ করেননি। যদিও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ঘনিষ্ঠরা এই ধরণের অভিযোগকে অস্বীকার করেছেন। তারা জানান, এটা এক ধরণের ষড়যন্ত্র।

সর্বশেষ যেটা মনে করা হয় যে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দলের উপর কর্তৃত্ব নেই। বিশেষ করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পছন্দের ব্যক্তি তিনি নন। এই কারণেই বিএনপিকে যদি ঢেলে সাজাতে হয়, গোছাতে হয় তাহলে এমন একজনকে দলের মহাসচিব করতে হবে যিনি তৃণমূলের কাছে আস্থাভাজন এবং দলের উপর যার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন সজ্জন ব্যক্তি, কিন্তু দলে তিনি জনপ্রিয় বা প্রশংসিত নন, বরং তিরস্কৃত। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সবসময় সিদ্ধান্তের জন্যে লন্ডনের দিকে তাকিয়ে থাকেন, এভাবে একটি দল চলতে পারে না বলে বিএনপির শীর্ষ একাধিক নেতা মনে করেন।

আত্মপক্ষ সমর্থন করে যা বললেন ফখরুল

এবিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘২০০৯ সালের পর থেকে বিশেষ করে ২০১২ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে নেয়ার পর থেকে সংবিধান পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ যে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে চাচ্ছে, তারই ফলশ্রুতিতে আমরা দেখছি, এখানকার সমস্ত রাজনৈতিক দলকে পুরোপুরিভাবে ইনঅ্যাক্টিভ (অকার্যকর) করে দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের বিরাজনীতিকরণের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় কিন্তু আজ দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে। আমাদের দলের প্রায় ৩৫ লাখ লোকের বিরুদ্ধে লক্ষাধিক মামলা, পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে গুম, সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে খুন করা হয়েছে। সত্য কথা বলতে কী, শুধু আমরা নই, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এমনকি মিডিয়া, কেউই এখানে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমার কাজ সফল হচ্ছে, কি হচ্ছে না, এটা বিচার করার দায়িত্ব তো আমার নয়। এটা জনগণ বিচার করবে এবং পার্টি সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু দল তো এখন পর্যন্ত সে ধরনের কথা বলেনি। দল সে ধরনের সিদ্ধান্ত যদি নেয়, তা কার্যকর হবে।’

মহাসচিবের দায়িত্বে আছেন গত প্রায় এক দশক ধরে, বিএনপির রাজনীতি নিয়ে আপনি কতটুকু সন্তুষ্ট, বিএনপি আসলে ঠিক পথে আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, ‘বিএনপি একটি উদারপন্থী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। বর্তমানে দেশে যে অবস্থা বিরাজ করছে, এখানে গণতন্ত্রের কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। সেক্ষেত্রে এখানে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিকভাবে কাজ করার পরিবেশ নেই এবং স্বাভাবিকভাবে আমরা এখানে যারা দায়িত্বে রয়েছি, কাজ করছি; আমাদের পক্ষে কাজ করা খুবই ডিফিকাল্ট (কষ্টকর) হয়ে যাচ্ছে।’

সোনালীনিউউজ/এএস

Side banner