• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২১, ১২ মাঘ ১৪২৭

নিষ্ঠুরতার আতঙ্কে নারীসমাজ


নিজস্ব প্রতিবেদক সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০, ০৩:৫৮ পিএম
নিষ্ঠুরতার আতঙ্কে নারীসমাজ

ঢাকা : স্বামীর সঙ্গে সিলেট এমসি কলেজে বেড়াতে গিয়ে একদল যুবকের ধর্ষণের শিকার হন সদ্য বিবাহিতা এক নারী। এই ঘটনায় সিলেটের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ছয় ছাত্রলীগ কর্মীসহ নয়জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। ধর্ষকদের গ্রেপ্তারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে এমসি কলেজ।

শুক্রবারের এই মর্মান্তিক ঘটনায় সারাদেশে সমালোচনা মধ্যে খোদ রাজধানীতে এক প্রতারকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে আরেক নারী। মুমূর্ষু স্বামীকে বাঁচাতে পাগলপ্রায় স্ত্রীকে রক্ত জোগাড় করে আশ্বাস দিয়ে মিরপুরের একটি বাসায় নিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন অভিযুক্ত মো. মনোয়ার হোসেন ওরফে সজীব। আর তাকে সহায়তা করেন মাশনু আরা বেগম ওরফে শিল্পী নামের এক নারী। এই দুজনকেই গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

দেশে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। তবে নারীর প্রতি এমন নিষ্ঠুরতার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। এ নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা।

দিনের পর দিন এমন ঘটনা বৃদ্ধির কারণে নারীর মধ্যে এক ধরনের ভয় তাড়া করছে বলেও মনে করছেন তারা। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) খাগড়াছড়িতে এক নারী ও এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা চরম উদ্বেগ আর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। পূর্বের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধী শাস্তি না পাওয়ায় নারীর প্রতি সহিংসতা দিন দিন বেড়েই চলছে।

খাগড়ছড়ির ঘটনায় এরইমধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ধর্ষণের ঘটনা বাড়তে থাকায় নারীদের মধ্যে উদ্বেগ যেমন বাড়ছে তেমনি বিদেশেও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন সাবেক আইনমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শফিক আহমেদ। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে হলেও ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের দাবি করেছেন তিনি।

শফিক আহমেদ বলেন, ‘সমাজে এমন বিশৃঙ্খল পরিবেশ সহ্য করা যায় না। সরকারকে বলবো কোনো ধরনের শৈথিল্য না দেখিয়ে ধর্ষণের মামলা দ্রুত তদন্ত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন দ্রুত চার্জশিট দিয়ে দেয়।’

জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, ‘আর বিচার প্রক্রিয়া শুরুর পর তা স্থগিত করার যে একটি বিষয় থাকে সেটাও বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে হলেও দ্রুততম সময়ে ধর্ষণের বিচার শেষ করতে হবে। তা না হলে নারীদের ভয় নিয়েই থাকতে হবে। পদে পদে তাদের ভয় তাড়া করবে। এটা কারো জন্যই সুখকর হবে না।’

যেভাবে রক্ত যোগাড়ের আশ্বাস দিয়ে ধর্ষণ : সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রবাসে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে সমালোচনার মধ্যে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মুমূর্ষু স্বামীর জন্য রক্ত জোগাড় করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন এক গৃহবধূ।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত মো. মনোয়ার হোসেন ওরফে সজীব ও ধর্ষণে সহায়তার অভিযোগে মাশনু আরা বেগম ওরফে শিল্পীকে গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর মিরপুরে মনিপুরীপাড়ায় শিফা ভিলা নামের একটি ফ্ল্যাট থেকে র‌্যাব-২ এর একটি বিশেষ দল তাদের গ্রেপ্তার করে।

র‌্যাব-২ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এএসপি মো. আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৪টার দিকে ভুক্তভোগী নারী অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগের ভর্তি করান। দায়িত্বরত চিকিৎসক স্বামীর জন্য রক্ত প্রয়োজন এবং জরুরিভাবে রক্তের ব্যবস্থা করার পরার্মশ দেন।

তিনি বলেন, ভুক্তভোগী নারী হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার ব্লাড ব্যাংকের সামনে গিয়ে তিন-চারজন পুরুষকে বসা দেখতে পেয়ে রক্তের বিষয়ে জানতে চাইলে মনোয়ার হোসেন ওরফে সজীব রক্তের ব্যবস্থা করে দেবেন বলে জানান। পরে দুপুর দেড়টার দিকে ওই নারীকে কৌশলে রক্তের ব্যবস্থা করে দেয়ার নাম করে মিরপুরে শিল্পীর বাসায় নিয়ে যান। ওই বাসায় নিয়ে শিল্পীর সহযোগিতায় তাকে ধর্ষণ করে মনোয়ার।

এএসপি মো. আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ভুক্তভোগী নারী লোকলজ্জার ভয়ে ও স্বামীর অসুস্থতার কারণে ধর্ষণের বিষয়টি গোপন রাখেন। কিন্তু ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তার স্বামীর মোবাইলে কল করে তারা রক্তের ব্যবস্থা হয়েছে জানিয়ে তার স্ত্রীকে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় পাঠাতে বলেন। তখন ওই নারী পুনরায় ধর্ষিত হওয়ার ভয়ে স্বামীকে বিষয়টি খুলে বলেন। পরে অভিযোগ পেয়ে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের কথা সজীব স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সিলেটের ভুক্তভোগী নারী : সিলেটে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে শুক্রবার রাতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন আরেক গৃহবধূ। রাত সাড়ে নয়টার দিকে টিলাগড় এলাকার কলেজটির ছাত্রাবাসে এ ঘটনা ঘটে। ওই গৃহবধূকে ক্যাম্পাস থেকে তুলে ছাত্রাবাসে নিয়ে ধর্ষণ করা হয় বলে পুলিশ জানায়। এ ঘটনায় নির্যাতিতার স্বামী বাদী হয়ে নগরীর শাহপরাণ থানায় মামলা করেন। এতে ছাত্রলীগের ছয় কর্মী ও অজ্ঞাতনামা আরও তিনজনকে আসামি করা হয়। যদিও এখনো আসামিদের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে করোনায় প্রতিষ্ঠান বন্ধের মধ্যে ছাত্রাবাস খোলা রাখায় কলেজের অধ্যক্ষের অপসারণ চেয়েছে ধর্ষকদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

অন্যদিকে ধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে ছাত্রাবাস বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে।

প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানে এসিডে ঝলসে গেলো খাদিজা : কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (কুমেক) বার্ন ইউনিটে এসিডে পোড়া যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন ১৩ বছর বয়সী তরুণী খাদিজা আক্তার মনি। বার্নিশ মিস্ত্রী অসুস্থ বাবা মোসলেম মিয়ার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না মেয়েকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা থেকে ঢাকা নেওয়া।

গত বৃহস্পতিবার  রাতে জানালা দিয়ে ছোড়া বোতল ভর্তি এসিডে খাদিজার শরীরের ৪০ ভাগ পুড়ে গিয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বাগড়া গ্রামে। খাদিজার পরিবারে সন্দেহ স্থানীয় আপন ও জাহিদ নামে দুই তরুণ তার মেয়ের শরীরে এসিড নিক্ষেপ করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, আপন ও জাহিদ পৃথকভাবে খাদিজাকে একাধিকবার প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। এমনকি বিভিন্ন সময় খারাপ প্রস্তাবও দেয় তারা। ওই দুই তরুণ সম্পর্কে চাচা ও জেঠাতো ভাই। তাদের বাড়ি ভোলা জেলায়। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বাগড়া গ্রামে থেকে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করে। তাদের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় রাতের অন্ধকারে জানালা দিয়ে এসিড নিক্ষেপ করতে পারে বলেন খাদিজার পরিবারের ধারনা। মেয়ের শরীরে এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় বাবা মোসলেম মিয়া কুমিল্লা ব্রাহ্মণপাড়া থানায় একটি মামলা করেছেন। ওই মামলা তদন্ত করতে গিয়ে হারুন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ।

ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজম উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘নির্যাতনের শিকার খাদিজার পরিবারের সন্দেহের তালিকায় আপন ও জাহিদ নামে দুই তরুণ রয়েছে। তবে আমরা মামলার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে হারুন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছি। সন্দেহের তালিকায় থাকা ওই দুই তরুণকে গ্রেফতার করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

খাদিজার বাবা মোসলেম মিয়া জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার নয়নপুর গ্রামে। বাড়িতে সম্পত্তি না থাকায় তারা কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বাগড়া গ্রামের হোসেন মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকেন। শরীরে বিভিন্ন রোগে বাসা বেধেছে তার। বার্নিশের কাজ করে কোনোভাবে ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন।

গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে খাদিজা জানালার পাশে বসে মোবাইলে গান শুনছিল। ঠিক ওই মুহূর্তে দুই থেকে তিন জন ব্যক্তি জানালা দিয়ে বোতলভর্তি এসিড তার মেয়ে খাদিজার শরীরে নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায়। তখন তাকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান তিনি। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চিকিৎসকরা কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন তাকে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এখানকার চিকিৎসকরা বলছেন, মেয়েকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে। কিন্তু আমার আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না।’

কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. রাসেল খান বলেন, ‘এসিডে ঝলসে গেছে মেয়েটির শরীরের প্রায় ৪৫-৫০ ভাগ। ৪০ ভাগ অতিক্রম করলেই আমরা কোনও পুড়ে যাওয়া রোগীকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রাখি না। কারণ আমাদের আইসিইউ’র চিকিৎসা সেবা নেই। শরীরের অতিরিক্ত স্থান এবং শ্বাসনালী পুড়ে যাওয়া রোগীদের জন্য আইসিইউ খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। ঠিক তখন ওই সেবা দিতে না পারলে পোড়া রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।’

ভারতে পালানোর চেষ্টা অর্জুনের, দাড়ি কাটেন সাইফুর : সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে নববধূ ধর্ষণের আলোচিত ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমানসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার ভোররাতে সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে পুলিশ ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহামনকে গ্রেপ্তার করে।

এছাড়া সকালে হবিগঞ্জের মাধবপুর সীমান্ত এলাকা থেকে মামলার চার নম্বর আসামি অর্জুন লস্করকে গ্রেপ্তার করা হয়। গণমাধ্যমকে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাইয়ুম।

ওসি জানান, ঘটনার পর থেকেই পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে কাজ করে যাচ্ছিল। সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে প্রধান আসামি এবং চার নম্বর আসামিকে হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানান তিনি। এছাড়া তারা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন সেজন্য সীমান্তে সতর্কতা জারির কথাও জানান ওসি।

অর্জুন লস্করকে ইতিমধ্যে সিলেট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আনা হয়েছে। সাইফুর রহমানকেও আনা হচ্ছে। তাদেরকে জেলা পুলিশ থেকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এর আগে গত শনিবার সকালে নির্যাতিতা গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমানকে প্রধান আসামি করে নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

মামলায় অভিযুক্তরা হলেন- এমসি কলেজ ছাত্রলীগকর্মী সাইফুর রহমান, কলেজের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাছুম, অর্জুন লস্কর ও বহিরাগত ছাত্রলীগ কর্মী রবিউল এবং তারেক আহমদ।

শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে টিলাগড় এলাকার এমসি কলেজে স্বামীর সাথে বেড়াতে আসা ওই তরুণীকে ক্যাম্পাস থেকে তুলে ছাত্রাবাসে নিয়ে ধর্ষণ করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জ্যোতির্ময় সরকার বলেন, ‘ওই নববধূ তার স্বামীর সঙ্গে এমসি কলেজে ঘুরতে আসেন। এক পর্যায়ে তার স্বামী সিগারেট খাওয়ার জন্য কলেজের গেইটের বাইরে বের হন। এসময় ৬/৭ জন যুবক তরুণীকে জোরপূর্বক তুলে এমসি কলেজ ছাত্রাবাস এলাকায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। এসময় তার স্বামী প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করা হয় বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। খবর পেয়ে পুলিশ রাত সাড়ে ১০টার দিকে ওই তরুণীকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করেছে।

ভারতে পালানোর চেষ্টা : ঘটনার চরম পরিণতি চাউর হওয়ার পালিয়ে আত্মগোপন করার চেষ্টা চালায় সাইফুর ও মামলাভুক্ত তার অপর সহযোগীরা। শখের দাড়ি কেটে এলাকা ছাড়ার ফন্দি করে সাইফুর। অন্যদিকে, ভারতে চলে যাওয়ার ধান্দায় ছিলেন অর্জুন লস্কর। তবে দু’জনকেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

জানা যায়, রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ভোরে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানাধীন সীমান্তবর্তী এলাকা খেয়াঘাট থেকে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সাইফুরকে গ্রেপ্তার করে। সাইফুর লাগঞ্জের চান্দাইপাড়া গ্রামের তাহিদ মিয়ার ছেলে। তাকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মহানগরের শাহপরাণ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সাইফুর গ্রেপ্তার এড়াতে বাঁচতে তার মুখের দাঁড়ি কেটে ফেলে। সে সীমান্ত পথ ব্যবহার করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। গ্রেপ্তারের পর সাইফুর পুলিশের কাছে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়।

এমসি কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, সাইফুর এমসি কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছে। তার ইভটিজিং ও হয়রানির কারণে এমসি কলেজ থেকে অনেক মেয়ে অন্য কলেজে চলে যায়। এমনকি কলেজে সাইফুরসহ তার সহযোগীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে চাঁদাবাজিও করে আসছে।

এদিকে ঘটনার অন্যতম আসামি অর্জুন লস্করকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে ভোর ৬টার দিকে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার মনতলা এলাকার দুর্বলপুর গ্রামে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। বিষয়টি নিশ্চিত করে মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অর্জুন মাধবপুর উপজেলার মনতলা সীমান্ত দিয়ে ভারত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। গ্রেপ্তারের পর তাকে সিলেটে নিয়ে গেছে সিলেট জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।

ধর্ষিতার জবানবন্দি : সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন ঘটনার শিকার সেই নববধূ। রোববার দুপুরে সিলেট মহানগর হাকিম তৃতীয় আদালতের বিচারক শারমিন খানম নিলার কাছে তিনি জবাববন্দি দেন বলে জানিয়েছেন সিলেট মহানগর আদালতের সহকারী কমিশনার প্রসিকিউশন অমূল্য কুমার। তিনি জানান, দুপুরে পুলিশ ওই তরুণীকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার থেকে আদালতে নিয়ে আসে। দুপুর দেড়টার দিকে তিনি আদালতে ওই রাতের ঘটনার ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। আদালত ২২ ধারায় তার জবানববন্দি লিবিবদ্ধ করে।

প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত কমিটি : এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে সিলেটে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কলেজের ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে ছাত্রাবাসের হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিনকে। অথচ মূলত তার আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের কয়েকটি ব্লক দখল করে রাখে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী। এদিকে নিরাপত্তা পালনে গাফিলতির অভিযোগে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ছাত্রাবাসের দুই নিরাপত্তা কর্মীকে বরখাস্ত করা হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিন।

এ বিষয়ে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, কমিটি যাতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ করে সেজন্য সবার পরামর্শ অনুযায়ী কলেজের গণিত বিভাগের প্রধান আনোয়ার হোসেন চৌধুরীকে আহ্বায়ক রাখা হয়েছে। আর ছাত্রাবাসের বিস্তারিত বিষয় জানার জন্য হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিনকে রাখা হয়েছে। সেইসঙ্গে ১ সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব নেওয়া আরেক হোস্টেল সুপার কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জীবন কৃষ্ণ ভট্টাচার্যকে সদস্য করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কলেজে বেড়াতে যাওয়া দম্পতিকে ধরে নিয়ে আসে ছাত্রলীগের ৫/৬ জন নেতাকর্মী। পরে তারা স্বামীকে আটকে রেখে নববধূকে গণধর্ষণ করে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ ওই দম্পতিকে উদ্ধার করে, তবে এর আগেই অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। এরপর মধ্যরাতে কলেজ ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমানের কক্ষ থেকে বেশ কিছু অস্ত্র জব্দ করা হয়।

এ ঘটনায় শনিবার সকালে ৯ জনকে আসামি করে ওই তরুণীর স্বামী বাদি হয়ে নগর পুলিশের শাহপরাণ থানায় মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন- এমসি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা ও ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), সাইফুর রহমান (২৮), রবিউল ইসলাম (২৫), অর্জুন লস্কর (২৫) ও তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮)। এদের মধ্যে অর্জুন ও তারেক (২৮) বহিরাগত ছাত্রলীগ কর্মী বলে জানা গেছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই