নিরাপত্তার চাদরে বরিশাল, তবুও শঙ্কায় প্রার্থীরা

  • বরিশাল প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৫:১১ পিএম
ছবি : প্রতিনিধি

বরিশাল: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটের দিন বরিশালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১৬ হাজার সদস্যকে মাঠে সক্রিয় করা হয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করতে নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা হয়েছে গোটা বরিশাল। তবুও শঙ্কায় রয়েছেন জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীরা।

পাশাপাশি সবধরনের বৈধ কাগজপত্রসহ তিনদিনে তিনবার আবেদন গ্রহণ করা সত্বেও বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর পর্যন্ত জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সাংবাদিকদের পর্যবেক্ষণের কার্ড না দিয়ে চরমভাবে হেনেস্তা ও হয়রানির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীরা।

সূত্র মতে, নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা বন্ধ হওয়ার পর থেকে শুরু করে বুধবার (১১ ফেব্রæয়ারি) পর্যন্ত বিভিন্ন আসনের প্রার্থীরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানিয়েছেন তাদের শঙ্কার কথা। সবশেষ বুধবার দুপুরে বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বরিশাল-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ মার্কার প্রার্থী রাজিব আহসান অভিযোগ করেন, তার নির্বাচনী এলাকায় বাহিরের আসন থেকে (যেখানে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী নেই) জামায়াতের নেতাকর্মীরা এসে অবস্থান করায় তিনি আতঙ্কিত বোধ করছেন।

একই দিন বরিশাল-৬ আসনে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লা মার্কার প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবী তালুকদার। তিনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে উদাসীনতার, অসহযোগিতা ও পক্ষপাতমূল আচরণের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িপাল্লার কর্মী সমর্থক ও এজেন্টদের ওপর হামলার অভিযোগ করে সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ অনুষ্ঠানে নির্বাচনী প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দল নিরপেক্ষ পেশাদার ভূমিকা পালনের আহবান করেন।

অপরদিকে বরিশাল-১ আসনের ফুটবল মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী বুধবার দুপুরে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, একটি দলের প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা তার (ফুটবল মার্কার) কর্মী সমর্থক ও এজেন্টদের বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে। এছাড়াও তারা সাধারণ ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে দেখিয়ে ভোট দেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে। যে কারণে তিনি (ইঞ্জিনিয়ার সোবহান) ভোটগ্রহণের দিন (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোট কেন্দ্রসহ ভোটারদের আসতে যেন কেউ বাঁধা প্রদান করতে না পারে সেজন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে জোর অনুরোধ জানিয়েছেন।

এর আগে বরিশাল-৩ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ নির্বাচনের দিন শঙ্কার কথা জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এছাড়া বরিশালের একাধিক প্রার্থী সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের নির্বাচনী এলাকায় বিশেষ দলের ক্যাডারদের দ্বারা ভোটারদের হুমকি, কেন্দ্রে যেতে বাঁধা ও নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।

এছাড়া জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের বিভিন্নস্থানে একাধিক হামলা মামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রার্থীসহ কর্মীদের কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করেও প্রশাসন থেকে অভিযোগ করা প্রার্থীরা কোন ধরনের সহযোগিতা পায়নি বলেও সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।

বরিশাল জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল এবং ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম সূত্রে জানা গেছে, তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরির মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, আনসার ও র‌্যাবের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। সেখানে নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বড় একটি জনবল নিয়োগ করা হয়েছে পুলিশ ও আনসার বাহিনী থেকে।

সূত্রে আরও জানা গেছে, বরিশাল জেলা পুলিশের অধীনে সাধারণ কেন্দ্রে দুইজন এবং গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে তিনজন করে পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। জেলায় সর্বমোট ১ হাজার ৩৮২ জন পুলিশ সদস্যর পাশাপাশি ৯৯টি মোবাইল টিম এবং ১২টি স্ট্রাইকিং টিম কাজ করছে।

ভোটের মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা থাকবে জোরালো। বরিশাল জেলার প্রতি উপজেলায় গড়ে ১০০ জন ও মেট্রোপলিটন এলাকায় ৪০০ জন করে সেনা সদস্য অবস্থান করবেন। এছাড়া প্রতি দুই থেকে তিনটি ইউনিয়নের জন্য একটি করে পেট্রোল টিম কাজ করছে। পাশাপাশি বিজিবির ১৪ প্লাটুন সদস্য জেলার বিভিন্নস্থানে মোতায়েন করা হয়েছে।

যার মধ্যে বরিশাল সদরে পাঁচ প্লাটুন ও বাকি নয়টি উপজেলায় নয় প্লাটুন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। র‌্যাবের পক্ষ থেকে ছয়টি বিশেষ পেট্রোল টিম সার্বক্ষণিক টহলে রয়েছে।

নদীবেষ্টিত অঞ্চল হওয়ায় বরিশালের জলপথেও কড়া নজরদারি রাখা হয়েছে। নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জেলার নদীপথগুলোতে অবস্থান করছে জাহাজ ‘বানৌজা সালাম’। যেখানে ৬০ জন কর্মকর্তা ও নাবিক দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে কোস্টগার্ডের দেড় শতাধিক সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। নদী এলাকার আটটি ভোট কেন্দ্রের সুরক্ষায় নৌপুলিশও দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সিসিটিভির আওতায় রাখা হয়েছে ভোটকেন্দ্রগুলোকে।

বরিশাল জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে বরিশাল-১ আসনে মোট ভোট কেন্দ্র ১২৯টি। এরমধ্যে সাধারণ ভোট কেন্দ্র ৪৩টি, গুরুত্বপূর্ণ ৫১টি ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ৩৫টি। বরিশাল-২ আসনে মোট ১৪০টির মধ্যে সাধারণ কেন্দ্র ২৫টি, গুরুত্বপূর্ণ ৫১টি ও অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ৬৪টি।

বরিশাল-৩ আসনের ১২৬টির মধ্যে সাধারণ ভোট কেন্দ্র ৩৭টি, গুরুত্বপূর্ণ ৩৯টি ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি। বরিশাল-৪ আসনে ১৪৯টির মধ্যে সাধারণ ভোট কেন্দ্র ৯৮টি, গুরুত্বপূর্ণ ১৭টি ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ৩৪টি। বরিশাল-৫ আসনের ১৭৬টির মধ্যে সাধারণ ভোট কেন্দ্র ৯৩টি, গুরুত্বপূর্ণ ৪৬টি ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ৩৭টি।

বরিশাল-৬ আসনের ১১৩টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে সাধারণ ভোট কেন্দ্র ৪৬টি, গুরুত্বপূর্ণ ৩২টি ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ৩৫টি। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশালের ছয়টি সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের ছয়জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন অন্যান্য দলের মনোনীত ও স্বতন্ত্র ৩০ জন প্রার্থী। 

পিএস