নাটোর: বর্জ্যকে বোঝা নয়, সম্পদে রূপান্তরের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন নাটোরের তরুণ উদ্ভাবক আবদুল্লাহ আলিম। সেই স্বপ্ন এবার জায়গা করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা প্রতিযোগিতা ‘বর্নিও ইন্টারন্যাশনাল ইনোভেশন ক্রিয়েটিভিটি কম্পিটিশন’ (বিআইআইসিসি) ২০২৬-এর আন্তর্জাতিক পর্বে স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন তিনি।
নিজের উদ্ভাবনী প্রকল্প ‘বিন টু বেনিফিট’-এর জন্য এ সম্মাননা পান নাটোরের সিংড়া উপজেলার খেজুরতলা এলাকার এই তরুণ। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্ভাবনী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে দেওয়া হয়েছে ‘বিআইআইসিসি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাওয়ার্ড’।
মালয়েশিয়ার ইয়াং সায়েন্টিস্ট অর্গানাইজেশন (এমওয়াইএসও)-এর উদ্যোগে এবং ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া সাবাহ’র (ইউএমএস) সহযোগিতায় আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের তরুণ উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশের পতাকা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন আবদুল্লাহ।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির নতুন ভাবনা
আবদুল্লাহ আলিমের ‘বিন টু বেনিফিট’ প্রকল্পটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেন্সর ও ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মডেল।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্মার্ট ডাস্টবিনে জমা হওয়া বর্জ্যের পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ডাস্টবিনের অবস্থান জানা এবং নির্দিষ্ট উৎস থেকেই বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থাও রয়েছে এতে। ফলে বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা আরও সহজ, কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব হবে।
শুধু বর্জ্য সংগ্রহ নয়, মানুষকে সচেতন করতেও রয়েছে অভিনব ব্যবস্থা। প্রকল্পটিতে অ্যাপভিত্তিক ‘গ্রিন কয়েন’ রিওয়ার্ড সিস্টেম রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট নিয়মে বর্জ্য ফেলার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা পুরস্কার পেতে পারবেন। এর মাধ্যমে একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় সাফল্যের পর এবার বিশ্বজয়
আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক অর্জনের আগে বিআইআইসিসি ২০২৬-এর জাতীয় পর্যায়েও স্বর্ণপদক অর্জন করেন আবদুল্লাহ আলিম। জাতীয় পর্যায়ের সেই সাফল্যই তাকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ এনে দেয়।
এখানেই থেমে নেই তার সাফল্যের গল্প। এর আগে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ইয়াং সায়েন্টিস্টস অ্যান্ড ইনোভেটরস ইনোভেশন ২০২৬’-এ জাতীয় পর্যায়ে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইমার্স এডুকেশনের আয়োজিত আন্তর্জাতিক ব্লগ রাইটিং প্রতিযোগিতায় বিশ্বব্যাপী রানারআপ হওয়ার গৌরবও রয়েছে তার ঝুলিতে। পাশাপাশি ইতালিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিএমএ আয়োজিত ‘স্টুডেন্ট এমপ্লয়মেন্ট থিংকিং কম্পিটিশন’-এ বিজয়ী হন তিনি।
নাটোরের ঘরের ছেলে, স্বপ্ন বিশ্বজয়ের
আবদুল্লাহ আলিম নাটোরের সিংড়া উপজেলার খেজুরতলা এলাকার মো. সাজ্জাদ হোসেন ও রেশমা বেগম দম্পতির সন্তান। ছোট্ট এলাকার এই তরুণের উদ্ভাবনী চিন্তা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক অর্জনের অনুভূতি জানিয়ে আবদুল্লাহ আলিম বলেন, “এ অর্জন বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণের স্বপ্ন, সাহস ও সম্ভাবনার প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের লাল-সবুজের পতাকা তুলে ধরতে পেরে আমি গর্বিত। সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশের তরুণরা প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্ব জয় করতে সক্ষম।”
তার এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং নাটোরসহ দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার নতুন দিগন্ত তৈরি করেছে। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও পরিবেশ সুরক্ষাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
পিএস