সুই-সুতা থেকে বিশ্ববাজার: ই-কমার্সের ডানায় স্বাবলম্বী নারী উদ্যোক্তারা

  • ফরিদপুর প্রতিনিধি  | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম
ছবি : প্রতিনিধি

ফরিদপুর: ঘরের কোণে অবসরের সঙ্গী হয়ে থাকা সুই-সুতার কাজ আজ পাড়ি দিচ্ছে সীমান্তের ওপারে। রান্নাঘরের গণ্ডি পেরিয়ে ইন্টারনেট আর ই-কমার্সের হাত ধরে নতুন পরিচয় গড়ে তুলছেন ফরিদপুরের নারী উদ্যোক্তারা। নকশী কাঁথার ঐতিহ্য, কুশি কাটার সূক্ষ্ম কারুকাজ, মাটি-কাঠের গহনা, সুপারি পাতার পরিবেশবান্ধব শোপিস, কেমিক্যালমুক্ত ড্রাই ফ্রুটস—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সুবাদে এসব দেশীয় পণ্য আজ পৌঁছে যাচ্ছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, এমনকি ইউরোপের ঘরে ঘরেও।

জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ফরিদপুরে বর্তমানে প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০ নারী উদ্যোক্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনলাইন মার্কেটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। শুধু সদর উপজেলাতেই বিভিন্ন সেক্টরে পাঁচ শতাধিক নারী নিয়মিত ই-কমার্স ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

নকশী কাঁথা আর কুশি কাটার বাহারি পুতুলের চাহিদা এখন কেবল দেশের বাজারে সীমাবদ্ধ নয়—আন্তর্জাতিক বাজারেও তৈরি হয়েছে জনপ্রিয়তা। ইউরোপ প্রবাসী বাংলাদেশিরাই এই পণ্যের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। ফরিদপুরের উদ্যোক্তাদের হাত ধরে বাংলার এই কারুশিল্প আজ পৌঁছে যাচ্ছে সুদূর প্রবাসেও।

নকশী কাঁথাকে সঙ্গী করে পথচলা শুরু করা উদ্যোক্তা লুবাবা তুল জান্নাত বলেন, ‘শুরুটা হয়েছিল একান্তই শখ থেকে। কিন্তু ই-কমার্সের কারণে এখন ঘরের বাইরে না গিয়েও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাহকদের কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে পারছি। অনলাইনে না আসলে বুঝতেই পারতাম না আমাদের হাতের কাজের চাহিদা এতটা ব্যাপক। এই কাজ আমাকে মানসিকভাবে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাসও দিয়েছে।’

কুশি কাটার সুই ও উলে পুতুল এবং ঘর সাজানোর সামগ্রী তৈরি করেন তানজিয়া আক্তার তমা। তাঁর কথায়, ‘একসময় অবসর কাটানোর জন্য কুশি কাটার কাজ করতাম। পরিবার-বন্ধুদের প্রশংসায় উৎসাহিত হয়ে অনলাইনে পেজ খুলি। এখন নিয়মিত অর্ডার আসছে, যা বিদেশেও যাচ্ছে। শখের কাজটাই আজ আয়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস, যা আমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখাচ্ছে।’

কাঠ, মাটি ও বিভিন্ন উপকরণে রং-তুলির কারুকাজে নেকলেস-চুড়ি তৈরি করেন তাবাচ্ছুম ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশীয় শিল্পকে আধুনিক রূপে তুলে ধরাই আমার মূল লক্ষ্য। হ্যান্ডমেড গহনার প্রতি তরুণ প্রজন্মের বিশেষ টান রয়েছে। সঠিক প্রচার ও সততা ধরে রাখতে পারলে এই খাত থেকে ভালো ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব।’

সুপারিগাছের ফেলে দেওয়া পাতার খোলস থেকে পরিবেশবান্ধব শোপিস গড়ে তোলা সাজিয়া জিনাত আরেফিন শান্তার কথায় উঠে আসে ব্যতিক্রমী এক উদ্ভাবনের গল্প ‘আমরা ফেলে দেওয়া সুপারি পাতা থেকে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব শোপিস তৈরি করছি, যা প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশ রক্ষা করছে, আবার ঘরের সৌন্দর্যও বাড়াচ্ছে। ই-কমার্সের সুবাদে পরিবেশ সচেতন মানুষজন উৎসাহ নিয়ে এই পণ্য কিনছেন।’

হস্তশিল্পের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন দিগন্ত খুলেছে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণেও। কোনো রাসায়নিক বা প্রিজারভেটিভ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিতে আম, আনারস, লেবু ও ড্রাগন ফল শুকিয়ে প্রিমিয়াম ড্রাই ফ্রুটস তৈরি করেন মুনিয়া আফরোজ লুবনা। তিনি বলেন, ‘ভেজালমুক্ত ও পুষ্টিকর খাবারের চাহিদা এখন তুঙ্গে। আমরা সম্পূর্ণ কেমিক্যালমুক্ত উপায়ে ফল শুকিয়ে ড্রাই ফ্রুটস তৈরি করি। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে স্বাস্থ্য সচেতন গ্রাহকদের কাছে এই পণ্য পৌঁছে দিতে পারছি, বিক্রি দিন দিন বাড়ছে।’

সফল এই উদ্যোক্তারা এখন অংশ নিচ্ছেন জেলাজুড়ে আয়োজিত মেলা ও প্রদর্শনীতেও। তবে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানান তাঁরা।

এ প্রসঙ্গে ফরিদপুর জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাশউদা হোসেন বলেন, ‘ফরিদপুরের নারী উদ্যোক্তাদের এই উদ্যোগ ও মেধা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও দক্ষ করে তুলতে আমরা ৫টি পৃথক ট্রেডে প্রতিবছর অন্তত ৪০০ জন নতুন নারী উদ্যোক্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এছাড়া ২৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা এবং ক্ষেত্রবিশেষে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে—মাত্র ৫% সার্ভিস চার্জে ও দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধের সুযোগ থাকায় উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ পড়ে না। আমরা চাই প্রতিটি নারী নিজ পরিচয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠুক।’

শখ থেকে শুরু হওয়া এই স্বপ্ন আজ ই-কমার্সের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে ডানা মেলেছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও সরকারের সহজ ঋণ সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে তা ফরিদপুরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্রে বড় রূপান্তর আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পিএস