ভরা পদ্মা। বিকেলের দমকা হাওয়ায় মুহূর্তেই উত্তাল হয়ে ওঠে নদীর ঢেউ। সেই উত্তাল জলরাশির বুকেই মায়ের কোলে করে বাড়ি ফিরছিল মাত্র ২০ দিন বয়সী তানিশা। মায়ের বুকের উষ্ণতা আর নিরাপদ ঘরে ফেরার স্বপ্ন—সবকিছুই যেন মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় ভয়াবহ আতঙ্কে। মাঝপথে হঠাৎ ডুবে যায় নৌকা। ছিটকে পড়ে যাত্রীরা, ভেসে যায় সবাই। মায়ের সঙ্গে ভেসে যায় নবজাতক তানিশাও।
শনিবার বিকেল ৫টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বাখেরআলী থেকে জোহরপুর-টেকের দিকে যাওয়ার পথে পদ্মা নদীতে এ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। নৌকাটিতে থাকা ১২ যাত্রীর মধ্যে ছিল সোহেল ও তানিয়া খাতুন দম্পতির মাত্র ২০ দিন বয়সী সন্তান তানিশা।
নৌকাডুবির পর উত্তাল পদ্মার স্রোতে ভেসে যেতে যেতে তানিশাসহ ১০ বাংলাদেশি পৌঁছে যান ভারতীয় জলসীমায়। সেখানে তাদের দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ।
ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা থানার তারানগরের বাসিন্দা শ্যামলাল মণ্ডল পুরো ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন। তিনি জানান, বিএসএফ সদস্যরা নদী থেকে বাংলাদেশিদের উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসেন। এ সময় ২০ দিন বয়সী তানিশা প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। পরে বিএসএফ সদস্যরা দ্রুত তাকে স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান। চিকিৎসার পর স্বস্তির খবর আসে—তানিশা সুস্থ আছে।
একদিকে নদীতে স্বজন হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে মাত্র ২০ দিনের শিশুকে নিয়ে উৎকণ্ঠা—দীর্ঘ সময়ের সেই দুশ্চিন্তার অবসান ঘটে রাতে। বিজিবির ৫৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান জানান, তানিশাসহ উদ্ধার হওয়া বাকি নয় বাংলাদেশিও সুস্থ অবস্থায় রাতে দেশে ফিরেছেন।
মাত্র ২০ দিনের তানিশা হয়তো জানেই না, জীবনের শুরুতেই তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে এক ভয়ংকর পরীক্ষা। মায়ের কোলে নিরাপদে ফেরার কথা ছিল যে শিশুটির, উত্তাল পদ্মার স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সীমান্তের ওপারে। শেষ পর্যন্ত মানুষের মানবিকতা, সীমান্তরক্ষীদের তৎপরতা আর ভাগ্যের সহায়তায় আবারও মায়ের কোলে ফিরেছে সে।
তানিশার এই ফিরে আসা যেন শুধু একটি শিশুর বেঁচে ফেরা নয়—উত্তাল পদ্মার বুকে হারিয়ে যেতে বসা এক পরিবারের নতুন করে বেঁচে থাকার গল্প।
এম