• ঢাকা
  • সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

তাড়াশ পৌরসভার ৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সহকারী প্রকৌশলী-ঠিকাদারের বিরুদ্ধে


হাদিউল হৃদয়, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম
তাড়াশ পৌরসভার ৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সহকারী প্রকৌশলী-ঠিকাদারের বিরুদ্ধে

ছবি : প্রতিনিধি

সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জের তাড়াশ পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়নের ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার অধিকাংশ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. মুকুল হোসেনের হোসেন ও স্থানীয় ঠিকাদার এস এস এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী সোহাগ রানার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে কাগজ কলমে থাকলেও বাস্তবে বেশিরভাগ প্রকল্পের কোন অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পৌরবাসীর একাধিক বাসিন্দার।

এদিকে তাড়াশ পৌরসভার অব্যস্থাপনা ও দুর্নীতির বিষয়ে জনমত জরিপ করেছেন ‘আমরাও আছি পাশে’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন। সেই জরিপেও উঠে এসেছে পৌরসভার অনিয়ম ও দুর্নীতির সুস্পষ্ট তথ্য। বিশেষ করে নূন্যতম নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত পৌরবাসী।

জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পৌরসভার মেয়রের পদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সুযোগে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. মুকুল হোসেন স্বল্প পরিচিত পত্রিকায় পৌরসভার রাস্তা ও ড্রেন নিমার্ণের জন্য ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার দরপত্র আহবান করেন। মূলত গোপনে দরপত্র আহবান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন সহকারী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. মুকুল হোসেন। পরে এস এস এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী সোহাগ রানার সাথে যোগসাযোশে মো. মুকুল হোসেন সব প্যাকেজের কাজ এস এস এন্টারপ্রাইজকে পেতে সহায়তা করেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে বৃহত্তর পাবনা ও বগুড়া জেলা নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আট কোটি ৪৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় তাড়াশ পৌরসভার উন্নয়নে।

অপর দিকে নাগরিক সেবা প্রদানে ব্যর্থ ও দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত তাড়াশ পৌরসভা বাতিলের পক্ষে মতামত দিয়েছেন পৌরসভার বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ আগেও তাড়াশ পৌরসভার অনিয়ম, দুর্নীতি তদন্ত করেছে দুদক। আমরা উচ্চহারে কর দিয়েই যাচ্ছি। অথচ, দুর্নীতির কারণে নূন্যতম নাগরিক সেবাটুকুও পাচ্ছি না।

পৌর শহরের বাজারের মুদি দোকানদার আনন্দ কুমার ঘোষ, রতন কুমার, স্বপন কুমার বলেন, তাড়াশ পৌরসভা হওয়ার ৯ বছরে কোথাও ড্রেন নির্মাণ করা হয়নি। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি হলে রাস্তাগুলো তলিয়ে যায়। বৃষ্টির পানি রাস্তা উপচে দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

শিউলি মেশিনারিজ নামে এক দোকানের মালিক মো. শাজাহান আলী মাষ্টার বলেন, বর্জ ব্যবস্থাপনা না থাকায় বাসা বাড়ি ও বাজারের ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে রাখে। আমার দোকানের সামনে তিন দিন আগে ময়লা ফেলে রেখেছে। দুর্গন্ধ ও মশা-মাছির উপদ্রবে দোকানে বসে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়েছে।

তাড়াশ পৌর শহরের দক্ষিণ পাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা মাহাতাব হোসেন বলেন, আমার বাড়ির সামনের রাস্তাটি যাতায়াতের জন্য শহরের ভেতরের রাস্তার বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ রাস্তাটি খানাখন্দে বেহাল।

সরেজমিনে, পৌর এলাকার কোথাও ড্রেন নির্মাণ করা হয়নি। বৃষ্টি হলে খোদ পৌর প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনেই হাঁটু পানি জমে থাকে। দৃশ্যত তিন থেকে চারটি রাস্তা পাওয়া গেছে, তাও বছর না যেতেই ভেঙে যাচ্ছে। পৌর শহরের মধ্যে তাড়াশ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের সামান্য রাস্তাটুকোও সংস্কার করা হয়নি। শহরের অন্যান্য রাস্তাগুলোরও বেহাল দশা। বেশির ভাগ ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা হয়েছে কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠের মধ্যে। শহরের বাজারের বেশ কয়েকটি দোকানের সামনে ময়লা-আবর্জনা চোখে পড়ে।

তাড়াশ উপজেলা নাগরিক আন্দোলনের আহবায়ক আব্দুর রাজ্জাক রাজু জানান, ‘গ’ শ্রেণির তাড়াশ পৌরসভা ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এত বছরেও পৌরবাসীর নূন্যতম নাগরিক সেবা দান নিশ্চিত করতে পারেননি পৌর কর্তৃপক্ষ। খেলার মাঠ, বিনোদন কেন্দ্র, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি গ্যারেজ, অটোভ্যান গ্যারেজ কোনটাই নেই। নাগরিকদের নিয়মিত কর পরিশোধের বিপরীতে কাঙ্খিত সেবা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তিনি।
  
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় ও সিরাগঞ্জ জেলা শহরের একাধিক ঠিকাদার বলেন, তাড়াশ পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়নের ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কাজ দরপত্রে ৫টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়। কিন্তু প্যাকেজ প্রতি প্রাক্কলিত ব্যয়ের টাকার পরিমাণ উল্লেখ না করায় শুভংকরের ফাঁকি রয়ে যায় ইজিপিতে দরপত্র দাখিলের। পরে সহকারী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. মুকুল হোসেন তার পছন্দের ঠিকাদারকে কোন প্যাকেজে কত টাকা তা জানিয়ে দেন। ফলে ১০% লেসে ৫ প্যাকেজে ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কাজ পেয়ে যায় এস এস এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী সোহাগ রানা।

ঠিকাদার এস এস এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী সোহাগ রানার দাবি, আমি কোথায় কি কাজ করেছি সাইনবোর্ড দেওয়া রয়েছে। বস্তুত পৌর এলাকা ঘুরে কোথাও রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের কোন সাইনবোর্ড পাওয়া যায়নি। তিনি প্রতিবেদককে সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য অনৈতিক প্রস্তাবের ইঙ্গিত দেন ও অনুরোধ করেন।   
       
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, তাড়াশ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. মুকুল হোসেনের দুর্নীতি পৌরবাসীর কাছে উন্মোচিত হওয়ার পর থেকে বদলির জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন তিনি। সর্বোপরি প্রকৌশলী মো. মুকুল হোসেন ও ঠিকাদার সোহাগ রানার দুর্নীতির সঠিক তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন পৌরবাসী। এ ক্ষেত্রে তারা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদুক) হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

‘আমরাও আছি পাশে’ স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠনের আহবায়ক সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা জানান, আমাদের স্বেচ্ছাসেবী ভলান্টিয়াররা জনস্বার্থে সম্প্রতি তাড়াশ পৌরসভার সেবার মানদন্ড যাচাই করেছেন বেশ কিছু লোকজনের সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে। সেই ফরমেটিং তথ্যেও উঠে এসেছে পৌরসভার নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র। বিশেষ করে সেবা বঞ্চিত নাগরিকদের অনেকে পৌরসভা বাতিল চেয়েছেন।

৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বরাদ্দে পৌর এলাকার কোন জায়গায় রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তাড়াশ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. মুকুল হোসেন। তবে তার দাবি নিয়ম মেনেই দরপত্র আহবান করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক নুসরাত জাহান বলেন, ৫টি প্যাকেজে কতটা রাস্তা ও কতটা ড্রেন নির্মাণ করার কথা ছিলো তা জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান, সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম।

পিএস

Link copied!