• ঢাকা
  • বুধবার, ০৩ জুন, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

বরিশালে হামের ছয় মাসে ৮ হাজারের বেশি আক্রান্ত, মৃত্যু ৪৫


বরিশাল প্রতিনিধি জুন ৩, ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
বরিশালে হামের ছয় মাসে ৮ হাজারের বেশি আক্রান্ত, মৃত্যু ৪৫

ছবি : প্রতিনিধি

বরিশাল: হাম-রুবেলা প্রতিরোধে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরও বরিশাল বিভাগে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা ৮ হাজার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে হাম ও হাম-সন্দেহে ৪৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, মৃতদের মধ্যে মাত্র তিনজনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম-রুবেলা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের ২ জুনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নতুন করে ১৫১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী এসেছে। এর মধ্যে ১৪৯ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময়ে ১০২ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়নি এবং হামে কোনো মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেনি।

ছয় মাসে ৮ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী ও এক মাসে মৃত্যু ২৫ শিশুর :  স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২ জুন পর্যন্ত বরিশাল বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট ৮ হাজার ৬৮ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ২২৫ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ সময় মোট ৭ হাজার ৬৯১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৭ হাজার ৬৯ জন শিশু। একই সময়ে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মোট ৪৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে মাত্র তিনজনের শরীরে পরীক্ষায় হাম-রুবেলা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল। গত এক মাসে বরিশাল অঞ্চলের সরকারি হাসপাতালগুলোতে হাম-সন্দেহে ২৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪২৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে সরকারি হাসপাতালের বাইরে কত শিশু আক্রান্ত হয়েছে বা মারা গেছে, তার কোনো পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে নেই।

শেবাচিমে সবচেয়ে বেশি রোগী : দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) হাম-সন্দেহভাজন রোগীর সবচেয়ে বড় চাপ সামলাচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ হাসপাতালেই চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৯৭৫ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৮২৯ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪১ জন রোগী ভর্তি হয়েছে এবং ৩৬ জন ছাড়পত্র পেয়েছে।

শেবাচিম হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (অর্থ ও ভান্ডার) ডা. আবদুল মুনয়েম সাদ বলেন,হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে চার শতাধিক শিশু চিকিৎসাধীন থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করছেন। অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে। তবে শিশুদের জ্বর, শরীরে লালচে দানা বা হাম-সদৃশ উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে আনার বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।

জেলা ভিত্তিক পরিস্থিতি :  শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সন্দেহভাজন রোগী ২,৯৭৫ জন, নিশ্চিত রোগী ৩৩ জন। বরিশাল সদর হাসপাতালে সন্দেহভাজন রোগী ৬৭৬ জন, নিশ্চিত রোগী ২১ জন। পটুয়াখালীতে সন্দেহভাজন রোগী ১,৮৪৬ জন, নিশ্চিত রোগী ৩১ জন।  ভোলায় সন্দেহভাজন রোগী ৭০৭ জন, নিশ্চিত রোগী ৪২ জন এবং মৃত্যু ৭ জন। পিরোজপুরে সন্দেহভাজন রোগী ৪৪৪ জন, নিশ্চিত রোগী ৪৫ জন এবং মৃত্যু ১ জন। বরগুনায় সন্দেহভাজন রোগী ৬৭৫ জন, নিশ্চিত রোগী ৬২ জন এবং মৃত্যু ৩ জন। ঝালকাঠিতে সন্দেহভাজন রোগী ৩৪৫ জন, নিশ্চিত রোগী ৯ জন এবং মৃত্যু ২ জন।

টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্য :  গত ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত বরিশাল বিভাগের ৪২টি উপজেলায় বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কেন্দ্রে ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩৮ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৪৭২ জন শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদানের হার ছিল ৯৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

কেন কমছে না সংক্রমণ? : বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে শেষ হলেও এর সুফল পুরোপুরি পেতে কিছুটা সময় লাগে। তবে ১০ মে পরও সংক্রমণের হার প্রত্যাশিতভাবে না কমায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ১৬০ জন হাম-সন্দেহভাজন শিশু বরিশাল বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য আসছে। এপ্রিল মাসে বিভাগের ৪২ উপজেলায় ২ হাজার ৮১৬ জন শিশু হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসে। তাদের মধ্যে ৫১ জনের হাম নিশ্চিত হয়। ওই মাসে ১৫ শিশুর মৃত্যু হয়, যার মধ্যে তিনজনের শরীরে হাম ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল। অন্যদিকে মে মাসে মারা যাওয়া ২৫ শিশুর কারও শরীরে পরীক্ষায় হাম-রুবেলা ভাইরাস শনাক্ত হয়নি।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, হাম-রুবেলা প্রতিরোধে পরিচালিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে বিভাগে প্রায় ৯৮ দশমিক ৬০ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এটি একটি বড় অর্জন। বর্তমানে হাসপাতালে আসা অধিকাংশ শিশু চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠছে। যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরীক্ষায় হাম-রুবেলা ভাইরাস শনাক্ত হয়নি। তারপরও আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা জোরদার করা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন,অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে শিশুদের টিকাদান সম্পন্ন করতে হবে এবং হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে।

পিএস

Link copied!