ফাইল ছবি
রাজশাহী: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ হাজার ৮৫২ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১১৫ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয়।
আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১০৫ জন, নারী ৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের একজন। বৈবাহিক অবস্থার বিবেচনায় ৪৮ জন বিবাহিত এবং ৬৭ জন অবিবাহিত। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৩৫ জন এবং ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৮০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া চারজন প্রবাসফেরত ব্যক্তিও আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। ফলে রাজশাহীতে এইচআইভি সংক্রমণে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা।
রামেক হাসপাতালের তথ্যে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমকামী ৫৮ জন, যৌনকর্মীর সংস্পর্শে আসা ৩৫ জন, সাধারণ জনগোষ্ঠীর ১৪ জন, তৃতীয় লিঙ্গের দুজন, যক্ষ্মা রোগী দুজন এবং একজন যৌনকর্মী রয়েছেন।
অন্যদিকে রাজশাহী সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যে হাসপাতালের বাইরে শনাক্ত আরও ৩৪ জন রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের সবাই সমকামী জনগোষ্ঠীর সদস্য। এদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ এবং তিনজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি। ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্য একত্র করলে রাজশাহীতে মোট শনাক্ত ১৩৯ জন আক্রান্তের মধ্যে ৯২ জনই সমকামী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে জানা যায়।
গোপন নেটওয়ার্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ নিয়ে উদ্বেগ:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর কয়েকটি নির্জন ও কম আলোকিত এলাকায় রাতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিয়মিত সমাগম ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সি অ্যান্ড বি মোড় (শিমলা), কোর্ট স্টেশন, ডিঙাডোবা, ফুলতলা এবং পদ্মাপাড়ের কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কার্যক্রম চলে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুধু সরাসরি যোগাযোগ নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও টেলিগ্রামভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে যোগাযোগ ও সদস্য সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে সংক্রমণ শনাক্ত ও প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাজশাহী বিভাগে গত কয়েক বছরে এইচআইভি সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজশাহী জেলায় ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৯২ জনই পুরুষ সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গভুক্ত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সদস্য, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৬৬ শতাংশ। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৯৪ জনে। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, সচেতনতার অভাব, সামাজিক সংকোচ এবং গোপন যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিভাগজুড়ে বাড়ছে সংক্রমণ:
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের আট জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩১০ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন সিরাজগঞ্জে। এরপর রয়েছে রাজশাহী (১৩১), বগুড়া (১০৯), পাবনা (৭৮), নওগাঁ (৬৫), নাটোর (৪৩), জয়পুরহাট (৩৭) এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ (২১) জেলা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণের এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
এইচআইভি ছড়ায় যেভাবে:
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন) ডা. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। বিশেষ করে পুরুষ সমকামীদের মধ্যে রিসিভটিভ পার্টনারদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
তিনি বলেন, এইচআইভি কেবল যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেই নয়; পরীক্ষা ছাড়া রক্ত গ্রহণ, একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার, মাদক গ্রহণে ব্যবহৃত সূঁচ ভাগাভাগি করা এবং মা থেকে শিশুর শরীরেও সংক্রমিত হতে পারে।
সামাজিক বৈষম্যও বড় বাধা:
এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আপোস’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস এন আব্দুল্লাহ আল রেজা বলেন, আক্রান্তদের অনেকেই পরিবার ও সমাজে বৈষম্যের শিকার হন। ফলে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা গ্রহণেও অনীহা দেখা দেয়।
তার মতে, এইচআইভি আক্রান্ত মানেই যে যৌন সংক্রমণের শিকার, এমন ধারণা সঠিক নয়। বিভিন্ন উপায়ে একজন ব্যক্তি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই আক্রান্তদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পরিহার করে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।
কিছু জটিলতা কারণে বাড়ছে সংক্রমণ:
গত বছরের ডিসেম্বরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার চালু হয়েছে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা, ওষুধ এবং কাউন্সেলিং সেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এর আগে শনাক্ত হওয়া অনেক রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি এখনো বগুড়ার শহিদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে থাকায় নিয়মিত ওষুধ সংগ্রহ ও ফলোআপ চিকিৎসার জন্য কিছু রোগীকে এখনো বগুড়ায় যেতে হচ্ছে।
রামেক হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টারের মুখপাত্র ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ বলেন, আক্রান্তদের শনাক্ত হওয়া ইতিবাচক বিষয়। কারণ এতে তারা দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আসেন এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে। তিনি জানান, বর্তমানে চিকিৎসা, ওষুধ ও কাউন্সেলিং সেবায় কোনো সংকট নেই। পুরোনো রোগীদের ফাইল স্থানান্তরের কাজও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে।
সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ:
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং সামাজিক বৈষম্য দূর করা। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা, নিরাপদ আচরণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির এই প্রবণতা এখনই গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা না করলে ভবিষ্যতে এটি আরও বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে রূপ নিতে পারে। তাই প্রতিরোধ, সচেতনতা ও চিকিৎসা—এই তিন দিকেই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিএস
























-6a397791a3645-20260622190839.jpg)














