ফাইল ছবি
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাজুল (তাইজুল) ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পির বিরুদ্ধে আড়াই কোটি টাকার বেশি অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
শুক্রবার (৬ মার্চ) ঢাকা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খানের স্বাক্ষর করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজধানীর পল্লবী এলাকায় পরিবহন খাত, ফুটপাতের অস্থায়ী বাজার, গার্মেন্টসের ঝুট কাপড় এবং ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে বাপ্পির বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে প্রধান আসামি করে অজ্ঞাতনামা আরও ৬ থেকে ৭ জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট।
সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পল্লবী–মিরপুর এলাকার এই প্রভাবশালী নেতার আয়-ব্যয় ও সম্পদ অর্জনের নানা তথ্য। তদন্তে দেখা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ‘স্মার্ট ফ্যাশন’ নামে একটি পোশাক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে ‘মেসার্স চৌধুরী এন্ড খান অটোব্রিকস’ নামে একটি ইটভাটার স্বত্বাধিকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন।
২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তাজুল ইসলাম চৌধুরী মোট ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫৫ টাকা আয় করেছেন বলে দাবি করেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই আয় এসেছে পোশাক ব্যবসা, মাছ ব্যবসা ও ইটভাটা পরিচালনা থেকে। একই সময়ে তিনি পারিবারিক ব্যয় দেখিয়েছেন ১ কোটি ১১ লাখ ৮৩ হাজার ২৭০ টাকা। সে হিসাবে সম্ভাব্য সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫ টাকা।
কিন্তু সিআইডির অনুসন্ধানে তার নামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য পাওয়া গেছে প্রায় ৪ কোটি ২৭ লাখ ২২ হাজার ৪৭১ টাকা। ফলে ঘোষিত আয় ও সম্পদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩৮৬ টাকার উৎস তিনি দেখাতে পারেননি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে আরও জানা যায়, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে অবস্থিত ‘মেসার্স চৌধুরী এন্ড খান অটোব্রিকস’ ইটভাটাটি নিষিদ্ধ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছিল। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ভাটাটির কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয় এবং ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবুও ওই ভাটা থেকে প্রায় ৪৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা আয় দেখানো হয়েছে, যা অবৈধ উৎসের বলে মনে করছে সিআইডি।
এ ছাড়া পল্লবীর উত্তর সেনপাড়া এলাকায় জমি কেনার সময় দলিলে প্রকৃত মূল্য গোপন করার অভিযোগও উঠেছে। দলিলে জমির মূল্য ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত মূল্য ছিল প্রায় ৫৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এভাবে প্রায় ৪৮ লাখ টাকার উৎস গোপন করার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। সব মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৫১ টাকা অবৈধভাবে অর্জন, স্থানান্তর ও রূপান্তরের প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি।
এই অভিযোগে গত ৫ মার্চ ডিএমপির পল্লবী থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধনী–২০১৫) এর ৪(২) ও ৪(৪) ধারায় মামলা করা হয়েছে। তদন্তে আরও দেখা গেছে, অভিযুক্তের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে মোট লেনদেন হয়েছে ৫৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বেশি। বর্তমানে এসব হিসাবের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৪৭১ টাকা আদালতের আদেশে জব্দ রয়েছে।
এ ছাড়া দুটি প্রতিষ্ঠানের ২০২৩ ও ২০২৪ সালের অডিট রিপোর্ট জাল করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। কারণ, যে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি করোনা মহামারির সময়ই মারা গেছেন। ফলে তার নাম ব্যবহার করে ভুয়া অডিট রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি।
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। পরে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। পুলিশের তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে তাজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পির নাম উঠে আসে বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করে গত ৬ জানুয়ারি ১৭ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তবে বাদীর নারাজির পর আদালত অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডিকে দেয়। বর্তমানে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় একাধিকবার পিছিয়েছে।
এসএইচ







































