• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা আজ, সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে কী


নিজস্ব প্রতিবেদক জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা আজ, সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে কী

ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং উচ্চ সুদের চাপে যখন দেশের অর্থনীতি চাপে রয়েছে, ঠিক সেই সময়েই চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবারের মুদ্রানীতিতেও ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো স্বস্তির বার্তা থাকছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভায় মঙ্গলবার অনুমোদনের পর আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে জানুয়ারি-জুন মেয়াদের মুদ্রানীতি বিবৃতি (এমপিএস) প্রকাশ করা হবে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আগের মতোই কড়াকড়ি বা সংকোচনমূলক নীতি বহাল রাখা হচ্ছে। ফলে নীতিগত সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত থাকছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিসংখ্যানগতভাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাস্তবে চাপ পুরোপুরি কমেনি। একসময় দুই অঙ্কে থাকা সার্বিক মূল্যস্ফীতি অক্টোবরে নেমে আসে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে। তবে নভেম্বর ও ডিসেম্বরে তা আবার বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮ দশমিক ২৯ ও ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে।

বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয়চাপ এখনও উল্লেখযোগ্য। খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই বাস্তবতায় সুদহার কমানোর পথে হাঁটতে রাজি নয় নীতিনির্ধারকেরা।

তবে কঠোর মুদ্রানীতির এই অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, যখন ব্যাংকগুলো নিজেরাই তারল্য সংকটে ভুগছে, তখন উচ্চ সুদহার বহাল রেখে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু মুদ্রানীতির নয়—এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও নৈতিক সঙ্কটের ফল। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দায়মুক্তি এবং ব্যাংক খাতে নীতিগত শিথিলতা আমানতকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে আগ্রহ হারাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে ঋণ বিতরণেও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু নভেম্বর পর্যন্ত বাস্তবে অর্জন হয়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। নতুন মুদ্রানীতিতে জুন নাগাদ এই প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হলেও ব্যবসায়ী মহলের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অর্জন কঠিন।

তাদের ভাষায়, উচ্চ সুদহার, দুর্বল ব্যাংকিং শৃঙ্খলা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন উদ্যোক্তারা।

নতুন মুদ্রানীতিতে সুদের হার করিডরের অন্যান্য সূচকেও উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসছে না। স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ), স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) এবং ওভারনাইট রেপো হারের সীমা প্রায় অপরিবর্তিত থাকছে।

ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নেওয়ার খরচ কমছে না, আর এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে গ্রাহকদের ঋণ সুদে। বর্তমানে গড় ঋণ সুদহার প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্বীকার করেছেন, সুদহার কমানোর দাবিতে ব্যবসায়ীদের যুক্তি রয়েছে। তবে তাঁর ভাষায়, মূল্যস্ফীতি আরও নিচে না নামা পর্যন্ত নীতিগত ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের ওপরে ছিল, এখন তা ৮ শতাংশের ঘরে এসেছে—এটি ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু মানুষের মধ্যে যে ‘দাম বাড়তেই থাকবে’—এই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেটি ভাঙতে সময় লাগে।”

ফরেক্স বাজারের অগ্রগতি তুলে ধরে গভর্নর জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রি করেনি; বরং প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য ফিরছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন মুদ্রানীতি স্বল্পমেয়াদে আর্থিক শৃঙ্খলা আনতে সহায়ক হলেও বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

এই প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা—নতুন মুদ্রানীতিও হয়তো আগের মতোই কাগজে কঠোর থাকবে, কিন্তু বাস্তব অর্থনীতিতে স্বস্তি আনতে ব্যর্থ হবে।

এম

Wordbridge School
Link copied!