চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে নভেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি ছিল ২৪ হাজার কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকায়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান কাঠামোর তুলনায় এতে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেতন-ভাতা বাড়তে পারে। এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে বেতন স্কেলের ধাপ ২০টিই বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বেতন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের কমিশন এই প্রতিবেদন প্রণয়ন করে। এ সময় অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী ও অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র জানায়, কমিশনের সুপারিশ যাচাই-বাছাই করে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির চূড়ান্ত হার নির্ধারণে সরকার একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করবে। পরে উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত পে-স্কেল অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচি ঘনিয়ে আসায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে বিষয়টি চূড়ান্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নতুন বেতনকাঠামোর আর্থিক চাপ বহন করতে হবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বেতন কমিশনের সুপারিশ অত্যন্ত বেশি এবং অস্বাভাবিক। তার মতে, এর আগে কোনো বেতন কমিশন এত উচ্চহারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়নি। তিনি বলেন, “এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। দেশের অর্থনীতি এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয়ের ভার বহন করার সক্ষমতা রাখে না।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ চলে যায় বেতন-ভাতায় এবং ২৫ শতাংশ ব্যয় হয় ঋণের সুদ পরিশোধে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে এই চাপ আরও বাড়বে। তার মতে, সরকারি চাকরির কাঠামো ছোট করা এবং অপ্রয়োজনীয় মন্ত্রণালয় কমানো জরুরি। তা না হলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। কমিশন ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে পুরোপুরি নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার সুপারিশ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও যেসব প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা, যাতায়াত ভাতা ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং পেনশনভোগীদের পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি। এছাড়া প্রতিবন্ধী সন্তান থাকা কর্মচারীদের জন্য বিশেষ ভাতা, টিফিন ভাতা বৃদ্ধি এবং প্রবীণ পেনশনভোগীদের চিকিৎসা ভাতা বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে।
প্রতিবেদন গ্রহণ করে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, সরকারি চাকরিজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে এই কাঠামোর অপেক্ষায় ছিলেন এবং কমিশন একটি সৃজনশীল ও পরিশ্রমী কাজ সম্পন্ন করেছে। অর্থ উপদেষ্টা জানান, সুপারিশ বাস্তবায়নের পথনকশা নির্ধারণে শিগগিরই একটি কমিটি গঠন করা হবে।
এদিকে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও উপসচিব আব্দুল খালেক বলেন, পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সংগঠনটি তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে। তবে তিনি চান, কমিশনের সুপারিশ চলতি বছর থেকেই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
এম







































