ফাইল ছবি
ঢাকা: ঈদুল আজহার উৎসব মানেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে জমিয়ে মাংসের নানা পদ উপভোগ করা। তবে আনন্দঘন এ সময়ে অসতর্কতার কারণে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।
এর মধ্যে মাংস খেতে গিয়ে গলায় হাড় আটকে যাওয়া খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। প্রতি বছরই এ ধরনের ঘটনায় অনেক মানুষকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়।
সাধারণত দ্রুত খাওয়া, খাবার ঠিকভাবে চিবিয়ে না গেলা কিংবা খাওয়ার সময় গল্পে মেতে ওঠার কারণে এমন বিপত্তি ঘটে। বিশেষ করে ছোট বা সূচালো হাড় গলায় আটকে গেলে তীব্র অস্বস্তি, ব্যথা এমনকি শ্বাসকষ্টও হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে গিয়ে ভুল পদ্ধতি অনুসরণ করলে সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই ঈদের আনন্দ যেন কোনো দুর্ঘটনায় ম্লান না হয়, সে জন্য গলায় হাড় আটকে গেলে কীভাবে প্রাথমিকভাবে সামলাতে হবে এবং কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে— এসব বিষয়ে আগে থেকেই সচেতন থাকা প্রয়োজন।
কেন ঘটে এ বিপত্তি?
খাবার গিলে ফেলার সময় আমাদের মুখ, জিব এবং খাদ্যনালির পেশিগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে খাবারকে পাকস্থলীতে পৌঁছে দেয়। কিন্তু মাংসের হাড় যদি খুব ছোট বা ধারালো হয় এবং তা ঠিকমতো চিবানো না হয়, তবে পেশির এ প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে এবং হাড়টি গলার কোনো অংশে আটকে যায়। সাধারণত তাড়াহুড়া করে খেলে, খেতে খেতে কথা বললে, বয়স্ক বা শিশুদের ক্ষেত্রে এবং দাঁতের সমস্যা থাকলে এই ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়। এছাড়া খুব শুকনা বা শক্ত মাংস খেলেও এমন সমস্যা হতে পারে।
হালকা কাশি দিন
গলায় কিছু আটকেছে মনে হলে প্রথমেই হালকা করে কাশি দেওয়ার চেষ্টা করুন। অনেক সময় কাশির ধাক্কায় ছোট হাড় সরে আসে। তবে খুব জোরে বা মারাত্মভাবে কাশির চেষ্টা করবেন না।
ধীরে ধীরে পানি পান
কয়েক ঢোক পানি খুব ধীরে ধীরে পান করুন, এতে হাড়টি নিচে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে গিলতে খুব বেশি কষ্ট হলে জোর করে পানি খাওয়া ঠিক হবে না।
নরম খাবার খাওয়া
সামান্য পরিমাণ নরম ভাত, কলা বা পানিতে ভেজানো রুটি খেয়ে দেখা যেতে পারে। তবে এটি করার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে, কারণ ধারালো হাড় হলে তা উল্টো আরও গভীরে গেঁথে যেতে পারে।
অপেক্ষা করুন
অনেক সময় হাড়ের আঁচড় লেগে গলার ভেতরে ক্ষত তৈরি হয়, যার ফলে মনে হয় কিছু আটকে আছে। যদি অস্বস্তি খুব বেশি না হয়, তবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে এই অনুভূতি চলে যেতে পারে।
যা করা একদমই উচিত নয়।
আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই ভুল পদ্ধতি অবলম্বন করেন, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। যেমন:
আঙুল ঢুকিয়ে হাড় বের করার চেষ্টা করা।
শুকনা ভাতের বড় দলা বা শক্ত খাবার জোর করে গেলা।
শিশুদের ক্ষেত্রে নিজে নিজে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ঘরোয়া সমাধান চেষ্টা করা।
শ্বাসকষ্ট শুরু হলে কালক্ষেপণ করা।
কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন?
কিছু লক্ষণ দেখা দিলে ঘরোয়া উপায়ের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হবে:
শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি।
কথা বলতে না পারা এবং অতিরিক্ত কাশি হওয়া।
লালা গিলতে প্রচণ্ড ব্যথা বা একেবারেই গিলতে না পারা।
বুকে ব্যথা হওয়া বা মুখ নীলচে হয়ে যাওয়া।
যদি এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে হাড় আটকে থাকার অস্বস্তি বজায় থাকে।
হাসপাতালে চিকিৎসকেরা সাধারণত এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে এই আটকে থাকা হাড় বের করে থাকেন। দেরি করলে খাদ্যনালিতে সংক্রমণ বা গভীর ক্ষত তৈরির ঝুঁকি থাকে।
জরুরি অবস্থা ও হাইমলিখ ম্যানুভার
যদি হাড় বা খাবারের বড় টুকরো শ্বাসনালিতে আটকে গিয়ে ব্যক্তি কথা বলতে বা শ্বাস নিতে না পারেন, তবে এটি একটি চরম জরুরি অবস্থা। এমন সময় আক্রান্ত ব্যক্তিকে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে পিঠে ৫ বার চাপড় দিতে হবে। এছাড়া জানাশোনা থাকলে ‘হাইমলিখ ম্যানুভার’ (পেটের ওপর বিশেষ পদ্ধতিতে চাপ প্রয়োগ) করা যেতে পারে, যা আটকে থাকা বস্তু বের করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি চিকিৎসার সহায়তা নিতে হবে।
সতর্কতাই সর্বোত্তম প্রতিরোধ
উৎসবের দিনগুলোতে একটু সতর্ক থাকলেই এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। মাংস খাওয়ার সময় ছোট হাড় আছে কি না তা ভালো করে দেখে নেওয়া এবং প্রতিটি লোকমা ভালোভাবে চিবিয়ে ধীরে ধীরে খাওয়া উচিত। বিশেষ করে পরিবারের শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের খাওয়ার সময় বাড়তি নজরদারি রাখা প্রয়োজন। মনে রাখবেন, একটু সচেতনতাই পারে আপনার উৎসবের আনন্দকে নিরাপদ রাখতে।
এসআই







































