• ঢাকা
  • শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

ভাষার জন্য রক্ত, বাংলার জন্য অঙ্গীকার : একুশ মানেই শিকড়ের জয়গান 


ওবাইদুল হক, কবি নজরুল কলেজ প্রতিনিধি ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম
ভাষার জন্য রক্ত, বাংলার জন্য অঙ্গীকার : একুশ মানেই শিকড়ের জয়গান 

ছবি : সংগৃহীত

ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয় এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, ইতিহাস, চিন্তা-চেতনা ও স্বপ্নের ভিত্তি। মানুষ যখন কথা বলে, তখন সে শুধু শব্দ উচ্চারণ করে না সে বহন করে হাজার বছরের ঐতিহ্য, বিশ্বাস, অনুভূতি ও সংগ্রামের উত্তরাধিকার। মাতৃভাষা মানুষের প্রথম উচ্চারণ, প্রথম কান্না, প্রথম হাসি, প্রথম ভালোবাসার প্রকাশ। তাই ভাষা হারানো মানে কেবল কিছু শব্দ হারানো নয়, এটি মানে নিজের শিকড়, নিজের ইতিহাস, নিজের অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলা।

আর ফেব্রুয়ারি মানেই শিমুল-পলাশের রঙে রাঙানো এক বিষাদময় গৌরবগাথা। ১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল তরুণ প্রাণের তাজা রক্তে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সেদিন যে আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়েছিল, তার লাভা আজও বাঙালির ধমনীতে বয়ে চলে। আজ ৭৪ বছর পেরিয়েও 'একুশ ' আমাদের কাছে কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এক অবিনাশী চেতনা আর শিকড়ের টানে ফিরে আসার অঙ্গীকার।

বাঙালির জন্য বাংলা ভাষা এমনই এক আত্মার নাম। এই ভাষায় রচিত হয়েছে বিশ্বকবির গান, বিদ্রোহীর উচ্চারণ, পল্লীকবির মাটির গন্ধমাখা কাব্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সুরে, কাজী নজরুল ইসলাম-এর বিদ্রোহে, জসীমউদ্দীন-এর পল্লীকথায় বাংলা ভাষা হয়ে উঠেছে বাঙালির আত্মার প্রতিচ্ছবি। এই ভাষায় লেখা হয়েছে প্রেম, প্রতিবাদ, বেদনা ও স্বপ্নের অগণিত গল্প।

কিন্তু একসময় এই ভাষার স্বীকৃতি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলয়ে যখন বাংলাকে প্রান্তিক করার চেষ্টা হলো, তখন সেটি ছিল কেবল ভাষাগত বৈষম্য নয় এটি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে অস্বীকার করার এক সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা।

*রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে সংঘাতের সূচনা—
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই কেন্দ্রীয় সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়। অথচ তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ছিল বাংলা ভাষাভাষী। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় এসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে ছাত্রসমাজ ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে রাজপথে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-কে কেন্দ্র করে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। গড়ে ওঠে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। দাবি একটাই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে হবে। কারণ ভাষা তাদের কাছে কেবল কথোপকথনের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু, সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ভিত্তি।

*১৯৫২: রক্তে লেখা ইতিহাস—
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ছাত্ররা সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজপথে নেমে আসে। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে।
তাদের আত্মত্যাগের ফলেই ১৯৫৬ সালে সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। ভাষা আন্দোলনই পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপণ করে।পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য এমন আত্মদানের নজির আর কোথাও নেই।

*আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: একুশ বিশ্বজুড়ে—
ভাষা শহীদদের স্মরণে ২১ ফেব্রুয়ারি আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের দিন। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিনটি পালিত হচ্ছে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহুভাষিক শিক্ষার স্বীকৃতি হিসেবে।

ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-এ প্রতিবছর লাখো মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় ভাষা শহীদদের। প্রভাতফেরি, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গান, কালো ব্যাজ—সবকিছু মিলিয়ে একুশ হয়ে ওঠে বাঙালির চেতনার প্রতীক।

*ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার—
ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আত্মমর্যাদার লড়াই। এর ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলনের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় অধিকার আদায় করতে হলে ঐক্যবদ্ধ হতে হয়, ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।

*বর্তমান প্রেক্ষাপট ও করণীয় —
আজ বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলেও চ্যালেঞ্জ শেষ হয়নি। প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুদ্ধ বাংলা চর্চা, মাতৃভাষায় শিক্ষার বিস্তার এবং আঞ্চলিক ভাষাগুলোর সংরক্ষণ—এসবই একুশের অঙ্গীকার পূরণের অংশ।

ভাষা শহীদদের রক্ত আমাদের শুধু অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয় না; এটি ভবিষ্যতের পথও দেখায়। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করা মানে নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে সম্মান করা।

*অঙ্গীকারের পুনর্নবীকরণ—
একুশ আমাদের শেখায়,ভাষা মানে ভালোবাসা, ভাষা মানে স্বাধীনতা, ভাষা মানে আত্মপরিচয়। সালাম-বরকতদের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারির মাটিতে দাঁড়িয়ে আমাদের শপথ হোক - বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করব, ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করব এবং একুশের চেতনাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেব। ভাষার জন্য যে রক্ত ঝরেছিল, তা বৃথা যায়নি। সেই রক্তের ঋণ শোধের একমাত্র উপায় বাংলার প্রতি অবিচল অঙ্গীকার।

*ভাষায় বাঙালির অস্তিত্ব —
​ভাষা আন্দোলন কেবল বর্ণমালা রক্ষার লড়াই ছিল না, এটি ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্বাধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার। একুশের চেতনাই বাঙালিকে শিখিয়েছিল কীভাবে মাথা নত না করে অধিকার আদায় করতে হয়।

*একুশ মানেই শিকড়ের জয়গান —
একুশ মানেই ফিরে দেখা নিজের ভেতরে, নিজের ইতিহাসে, নিজের শিকড়ে। ফেব্রুয়ারির হিমেল ভোরে খালি পায়ে প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে অর্পিত ফুল, আর কণ্ঠে ধ্বনিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’সব মিলিয়ে একুশ হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের গভীরতম উচ্চারণ।

ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি প্রথম শিখেছিল নিজের শিকড়কে অস্বীকার করে কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না। মাতৃভাষা মানুষের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শেখা শব্দ, প্রথম অনুভূতির নাম। তাই ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম ছিল আসলে আত্মমর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম।

শহীদ মিনারের সাদা স্তম্ভগুলো আজও যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই অমর পঙক্তি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই ভাষাকে হৃদয়ে লালন করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর প্রকৃত ইতিহাস পৌঁছে দেওয়াই হোক আমাদের আজকের শপথ।

ভাষার জন্য যে রক্ত ঝরেছিল, তা বৃথা যায়নি। সেই রক্তের ঋণ শোধের একমাত্র উপায় বাংলার প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। একুশ তাই কেবল স্মরণ নয়, এটি দায়িত্ব এবং এটি শিকড়ের জয়গান।

যতদিন বাংলার আকাশে সূর্য উঠবে, যতদিন বাংলার মাটিতে শিশুরা প্রথম ‘মা’ ডাক দেবে, ততদিন একুশ থাকবে রক্তে লেখা শপথ হয়ে, হৃদয়ে জাগ্রত অঙ্গীকার হয়ে।

Wordbridge School
Link copied!