• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

নিরাপত্তার সংকটে সাজেক, শঙ্কিত পর্যটক, উত্তপ্ত সমতল


দেলোয়ার জাহিদ অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
নিরাপত্তার সংকটে সাজেক, শঙ্কিত পর্যটক, উত্তপ্ত সমতল

ফাইল ছবি

রাঙামাটির মেঘে ঢাকা পাহাড়, সবুজ উপত্যকা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত সাজেক ভ্যালি আজ নতুন করে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় সংঘাত ও সড়ক অবরোধের ঘটনায় পর্যটকদের আটকে পড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একটি উদ্বেগজনক দিক উন্মোচন করেছে। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে এমন পরিস্থিতি শুধু ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে না; এটি স্থানীয় মানুষের জীবিকা, পর্যটননির্ভর অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ঘটনাটির জন্য পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যদের দায়ী করেছে। প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, অবরোধের সময় পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকে পড়ার পর সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে তাঁদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।

অন্যদিকে, ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। ফলে অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা জরুরি। স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ছাড়া কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা সমীচীন নয়।

তবে দায় নির্ধারণের তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষায় পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্থগিত থাকতে পারে না। সাজেকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাই তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংকটের গভীরতর কারণগুলো পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানায়।

১. সাজেকের সংকট: বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ?

সাজেক রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা। কিন্তু এর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ, প্রশাসনিক সমন্বয়, স্থানীয় রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন গভীরভাবে জড়িত। পাহাড়ের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের মধ্যে প্রভাব বিস্তার, সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চাঁদাবাজির অভিযোগ, ভূমি-অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটকে শুধু একটি সংগঠনের তৎপরতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে এর বহুমাত্রিক চরিত্র আড়ালে থেকে যায়। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকারসংক্রান্ত উদ্বেগ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সাম্প্রতিক অবরোধের পেছনে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর উপস্থিতি ও প্রভাব নিয়ে বিরোধ, স্থানীয় অধিকারভিত্তিক দাবিদাওয়া এবং সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগের কথা সামনে এসেছে। এসব দাবির প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা এবং সংঘাতের ধারাবাহিকতা নির্ধারণে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, নির্ভরযোগ্য নথি ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।

এখানে রাষ্ট্রের সামনে দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব রয়েছে: একদিকে সশস্ত্র সহিংসতা ও বেআইনি কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের বৈধ রাজনৈতিক দাবি, মানবাধিকার ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ দুই দায়িত্বকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখলে সংকটের স্থায়ী সমাধান আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

২. পর্যটকদের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

পর্যটকরা কোনো রাজনৈতিক বিরোধের পক্ষ নন। তাঁদের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া, বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আটকে রাখা কিংবা সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে বাধ্য করা বা মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা গুরুতর মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত উদ্বেগ সৃষ্টি করবে।

সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে আটকে পড়া পর্যটকদের উদ্ধার তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু উদ্ধার অভিযান সফল হওয়াই নিরাপত্তা ব্যবস্থার পূর্ণ সাফল্য নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, পর্যটকেরা কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়লেন? অবরোধের আশঙ্কা সম্পর্কে আগাম তথ্য ছিল কি না, ভ্রমণকারীদের সতর্ক করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত যোগাযোগ ও নিরাপদ প্রত্যাহারের পরিকল্পনা কতটা প্রস্তুত ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দায়িত্ব কেবল সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঝুঁকি মূল্যায়ন, গোয়েন্দা তথ্যের যথাযথ ব্যবহার, প্রশাসনিক সমন্বয়, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং নাগরিকদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও এর অপরিহার্য অংশ।

একই সঙ্গে নিরাপত্তা অভিযানে স্থানীয় জনগণের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে দায়ী করা দীর্ঘমেয়াদে অবিশ্বাস বাড়াতে পারে। অপরাধের দায় নির্ধারিত হওয়া উচিত ব্যক্তির ভূমিকা ও প্রমাণের ভিত্তিতে।

৩. আঞ্চলিক রাজনীতি, সশস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক সমাধানের সংকট

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), ইউপিডিএফ এবং অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। তবে এসব সংগঠনের অবস্থান, কার্যক্রম ও পারস্পরিক সম্পর্ক সময় ও পরিস্থিতিভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই প্রতিটি সংঘাতের পেছনে একই কারণ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।

আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ যখন সশস্ত্র সংঘাত, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টির পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তার মূল্য দিতে হয় স্থানীয় জনগণকে। পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, হোটেলকর্মী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং কৃষিপণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপও প্রয়োজন। কারণ, কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সাময়িকভাবে সড়ক সচল করা গেলেও ভূমি, প্রতিনিধিত্ব, আঞ্চলিক কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ অমীমাংসিত থাকলে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

সংলাপের অর্থ সহিংসতার প্রতি ছাড় দেওয়া নয়। বরং সহিংসতা বন্ধের শর্ত, রাজনৈতিক দাবির যাচাই, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা। রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং রাজনৈতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে।

৪. ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি: অসম্পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রশ্ন

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির প্রসঙ্গ অনিবার্য। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান, আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করা, ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত হলেও এর বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে সরকারি বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পক্ষগুলোর মূল্যায়নে পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্যকারিতা, প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনর্বাসনের প্রশ্ন আলোচনায় রয়েছে।

চুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়নকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি সহিংস ঘটনার একমাত্র কারণ বলা যাবে না। তবে রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকলে আস্থার সংকট গভীর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেই শূন্যতা বিভিন্ন পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিরাপত্তাহীনতাকে আরও জটিল করতে পারে।

তাই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে একটি স্বচ্ছ, তথ্যনির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক পর্যালোচনা প্রয়োজন। কোন ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে, কোথায় অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত, কোন প্রতিষ্ঠান কী দায়িত্ব পালন করছে এবং কোন বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন—এসবের একটি হালনাগাদ মূল্যায়ন প্রকাশ করা উচিত।

শান্তিচুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতপার্থক্যের সমাধান হওয়া প্রয়োজন সংলাপ, আইনি প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে; সহিংসতা বা সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করে নয়।

৫. পর্যটন অর্থনীতি: নিরাপত্তাহীনতার বহুমাত্রিক মূল্য

সাজেকের পর্যটন অর্থনীতি শুধু রিসোর্ট বা হোটেল ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত জিপ ও চাঁদের গাড়ির চালক, পরিবহনমালিক, পর্যটন গাইড, খাবারের দোকান, স্থানীয় বাজার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর কৃষিপণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত মানুষ।

অবরোধ, সংঘাত, ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পর্যটকেরা বুকিং বাতিল করতে পারেন। এতে ব্যবসার আয় কমে, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয় এবং স্থানীয় পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি সাজেকের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সুনামও ক্ষুণ্ন হতে পারে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর–অক্টোবরের পার্বত্য অঞ্চলের অস্থিরতা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে পর্যটন খাতের উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির অনুমান তুলে ধরা হয়েছিল। কোনো কোনো হিসাবে দৈনিক প্রায় ৮০ লাখ টাকা ক্ষতি, রাঙামাটি হলিডে কমপ্লেক্সের দৈনিক প্রায় ৪ লাখ টাকা ক্ষতি এবং অক্টোবর মাসে রাঙামাটিতে ৬০–৬৫ কোটি টাকা সম্ভাব্য ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এসব অনুমান ভিন্ন সময়কাল, এলাকা ও ব্যবসায়িক পরিসরের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল; এগুলোকে সমন্বিত ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত সরকারি হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

২২ অক্টোবরের সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে পর্যটন খাতে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতেও পৃথক তথ্য সংগ্রহ প্রয়োজন। কতটি বুকিং বাতিল হয়েছে, কতজন পর্যটক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কতদিন পরিবহন বন্ধ ছিল এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার আয় কতটা কমেছে—এসব তথ্য ছাড়া নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়।

সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত পর্যটন-পরিসংখ্যান প্রকাশের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এতে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং নিরাপদ পর্যটন পুনরুদ্ধারের নীতি প্রণয়ন সহজ হবে।

৬. যোগাযোগব্যবস্থা ও জরুরি প্রস্তুতির দুর্বলতা

সাজেকে যাতায়াতের ক্ষেত্রে খাগড়াছড়ি–দীঘিনালা–বাঘাইহাট হয়ে সড়কপথ গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট সড়কে অবরোধ বা সংঘাত দেখা দিলে পর্যটকদের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, দীর্ঘ পথ এবং বিকল্প যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা জরুরি উদ্ধারকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

এ কারণে পর্যটন মৌসুমে আগাম ঝুঁকি মূল্যায়ন, সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যটক ও পরিবহন অপারেটরদের সতর্কবার্তা এবং প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বিকল্প সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা উচিত। বিকল্প সড়ক, জরুরি উদ্ধারকেন্দ্র কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে আকাশপথে উদ্ধার কার্যক্রমের সম্ভাব্যতা ভৌগোলিক, পরিবেশগত, আর্থিক ও নিরাপত্তাগত বিবেচনায় মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তবে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণই সমাধান নয়; বিদ্যমান যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা কার্যকর করাও জরুরি।

পর্যটকদের যাত্রার আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে ভ্রমণ সীমিত করা এবং আটকে পড়া ব্যক্তিদের জন্য সমন্বিত যোগাযোগকেন্দ্র চালু করা যেতে পারে। কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে তার কারণ, কার্যকারিতার সময়সীমা এবং পুনরায় ভ্রমণ শুরুর শর্ত স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।

৭. কাঠামোগত দুর্বলতা ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি

সাজেকের পরিস্থিতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত দুর্বলতা সামনে আনে।

প্রথমত, আগাম ঝুঁকি নিরূপণ: অবরোধ ও সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে পর্যটকদের দ্রুত সতর্ক করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতাও পর্যালোচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়: জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পরিবহনমালিক এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় না থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হতে পারে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তি: আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভূমি-অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ এবং শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্যকে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, জবাবদিহি: সংঘাতের সময় কারা সহিংসতায় জড়িত ছিল, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার জন্য কার কী ভূমিকা ছিল এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না—এসব প্রশ্ন নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

পঞ্চমত, সামাজিক আস্থা: স্থানীয় জনগণকে কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতাধীন জনগোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাদের মতামত, অভিজ্ঞতা ও অধিকারকে গুরুত্ব না দিলে স্থায়ী সমাধানের ভিত্তি দুর্বল থেকে যাবে।

৮. উত্তরণের পথ: নিরাপত্তা, সংলাপ ও জবাবদিহির সমন্বিত কৌশল

সাজেক ও বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।

১. সংঘাতের নিরপেক্ষ তদন্ত: ২২ অক্টোবরের ঘটনার একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে গুলিবর্ষণ, অবরোধ, পর্যটকদের আটকে পড়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ যাচাই করতে হবে। তদন্তের ফলাফল যথাসম্ভব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

২. পর্যটক সুরক্ষায় কার্যকর জরুরি পরিকল্পনা: পর্যটনকেন্দ্রের ঝুঁকি মূল্যায়ন, আগাম সতর্কবার্তা, জরুরি হটলাইন, নিরাপদ সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা এবং স্থানীয় পরিবহন অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

৩. সশস্ত্র সহিংসতা ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা: কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির পরিচয় নির্বিশেষে প্রমাণিত অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা অভিযানে বেসামরিক মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

৪. অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ: আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন, স্থানীয় কার্বারি, জনপ্রতিনিধি, নারী, যুবসমাজ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, পরিবহন ও পর্যটন ব্যবসায়ী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা করা উচিত। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার বজায় রেখেও সাধারণ মানুষের চলাচল ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করার বিষয়ে কার্যকর সমঝোতা প্রয়োজন।

৫. শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন পর্যালোচনা: ১৯৯৭ সালের চুক্তির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার বাস্তবায়ন নিয়ে সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অংশগ্রহণে পর্যালোচনা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। ভূমি কমিশনকে কার্যকর করা, প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের অমীমাংসিত বিষয় চিহ্নিত করা এবং পুনর্বাসনসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি মূল্যায়ন করা এ প্রক্রিয়ার অংশ হওয়া উচিত।

৬. পর্যটন অর্থনীতির পুনরুদ্ধার: নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন মূল্যায়ন করে উপযুক্ত সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বুকিং, পর্যটক উপস্থিতি, ব্যবসায়িক আয় ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

৭. স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও আস্থা বৃদ্ধি: পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, অধিকার ও জীবিকার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় জনগণকে অবরোধ বা সংঘাতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি তাদের বৈধ দাবি উত্থাপনের গণতান্ত্রিক সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

সাজেকের নিরাপত্তা মানেই পাহাড়ে শান্তির প্রশ্ন

সাজেকের সাম্প্রতিক সংঘাত বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পর্যটন সম্ভাবনা ও উন্নয়ন অবকাঠামো থাকলেই কোনো অঞ্চল নিরাপদ হয়ে ওঠে না। নিরাপত্তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে কার্যকর প্রশাসন, আইনের শাসন, রাজনৈতিক সমঝোতা, স্থানীয় জনগণের আস্থা এবং অধিকার সুরক্ষার ওপর।

২২ অক্টোবরের ঘটনায় আইএসপিআরের অভিযোগ ও ইউপিডিএফের পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত সত্য নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। একই সঙ্গে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব করা উচিত নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটকে শুধু সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি অমীমাংসিত থেকে যাবে। আবার রাজনৈতিক অভিযোগের আড়ালে সহিংসতা, ভয়ভীতি বা নাগরিকদের চলাচলে বাধাকে উপেক্ষা করলেও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একই সঙ্গে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সংলাপ ও জবাবদিহির নীতি অনুসরণ করা।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নে অগ্রগতি, ভূমি-অধিকারসংক্রান্ত বিরোধের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং সব সম্প্রদায়ের মানবাধিকার সুরক্ষা—এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা তাৎক্ষণিক সাফল্য; কিন্তু তাঁদের আবার নিরাপদে সাজেকে যাওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি করাই হবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।

সাজেককে নিরাপদ করা তাই কেবল পর্যটন রক্ষার কর্মসূচি নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, ন্যায়বিচার, নাগরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বৃহত্তর পরীক্ষাও। সমতলের রাজনৈতিক অস্থিরতার সাথে এ সংঘাতের উত্তপ্ত ছড়িয়ে পড়ার আশংকা করছেন বোদ্ধা মহল। 

এসএইচ 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।

Link copied!