ফাইল ছবি
ভৌগোলিকভাবে অস্ট্রেলিয়া এশিয়ার অংশ নয়-এ কথা সবারই জানা। কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলের দিকে তাকালে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়া খেলছে এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে। প্রথম দেখায় বিষয়টি অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলের সমীকরণটা একটু ভিন্ন। এখানে মহাদেশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ফুটবল কনফেডারেশনের সদস্যপদ। আর এই নিয়মের কারণেই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে এশিয়ার দেশ হিসেবে মাঠ মাতাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়া ছিল ওশেনিয়া ফুটবল কনফেডারেশনের (ওএফসি) সদস্য। কিন্তু সেই অঞ্চলে তাদের সমকক্ষ কোনো প্রতিপক্ষ ছিল না। প্রতিযোগিতার মান তুলনামূলকভাবে বেশ কম হওয়ায় দেশটির ফুটবলের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। ওশেনিয়া অঞ্চলের দলগুলোর বিপক্ষে ম্যাচগুলো প্রায়ই রূপ নিত গোলবন্যার একতরফা লড়াইয়ে।
২০০১ সালের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের একটি ম্যাচ তো ফুটবল ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেয়। সেই ম্যাচে আমেরিকান সামোয়াকে ৩১-০ গোলে হারিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া, যা আজ পর্যন্ত পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের রেকর্ড। ওই একই বাছাইপর্বে তারা টোঙ্গাকেও হারিয়েছিল ২২-০ গোলে। এসব ম্যাচ স্পষ্ট করে দিচ্ছিল, ওশেনিয়াতে অস্ট্রেলিয়ার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।
কিন্তু বড় সমস্যা তৈরি হতো বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে যাওয়ার শেষ ধাপে। ওশেনিয়ার চ্যাম্পিয়ন দল সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেত না। মূল পর্বে যেতে হলে তাদের অন্য মহাদেশের শক্তিশালী দলের বিপক্ষে প্লে-অফ খেলতে হতো। ফলে ওশেনিয়াতে অপরাজেয় দল হওয়া সত্ত্বেও ১৯৮৬, ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফের বৈতরণী পার হতে পারেনি সকারুজরা। বারবার এই ব্যর্থতার পর নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য হয় তারা।
ফুটবলের উন্নতির স্বার্থে অস্ট্রেলিয়া তখন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনে (এএফসি) যোগ দেওয়ার আবেদন করে। অবশেষে ফিফা, এএফসি এবং ওএফসি-তিন পক্ষের সম্মতিতে ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এশিয়ান ফুটবল পরিবারের স্থায়ী সদস্য হয়ে যায়।
এএফসিতে যোগ দেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার ফুটবল চিত্রটাই বদলে গেছে। শুধু বিশ্বকাপ বাছাই নয়, তারা নিয়মিত অংশ নিচ্ছে এশিয়ান কাপ ও ক্লাব পর্যায়ের শীর্ষ প্রতিযোগিতাগুলোতে। ২০০৭ সালে তারা প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে অংশ নেয়। আর ২০১৫ সালে নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান কাপের শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়ে দলটি।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও কাতারের মতো এশিয়ার শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার ফুটবলের মান আরও উন্নত ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। দেশটির সাবেক কোচ গ্রাহাম আর্নল্ডও বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, ‘এশিয়ায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত অস্ট্রেলিয়ার ফুটবলকে উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
এশিয়ান কনফেডারেশনে যোগ দেওয়ার বড় সুফল অস্ট্রেলিয়া পাচ্ছে বিশ্বকাপেও। ২০০৬ সালের পর থেকে দলটি ধারাবাহিকভাবে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিচ্ছে। সবশেষ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও তারা চমক দেখিয়ে জায়গা করে নিয়েছিল শেষ ১৬-তে।
কাগজে-কলমে বা মানচিত্রের সীমানায় অস্ট্রেলিয়া এশিয়ার অংশ না হলেও, ফুটবলের মাঠে তারা এখন খাঁটি এশিয়ান। আর তাই বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সব পরিসংখ্যানে অস্ট্রেলিয়াকে এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবেই গণ্য করা হয়।
এসএইচ







































