ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংরক্ষিত নারী আসন ঘিরে নাটোর জেলা বিএনপির রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। এবার সংসদে বিএনপি ৩৫টি সংরক্ষিত নারী আসন পেতে পারে—এমন সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে নাটোর থেকে অন্তত পাঁচ নারী নেত্রী মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। দলীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চূড়ান্ত মনোনয়ন নির্ধারণ করবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হতে নাটোরের যেসব নেত্রী আলোচনায় রয়েছেন তারা হলেন—সাবিনা ইয়াসমিন ছবি, সাবেক এমপি সুফিয়া হক, অ্যাডভোকেট আইনুন নাহার, মহুয়া নূর কচি ও সানজিদা ইয়াসমিন তুলি। ইতোমধ্যে তারা দলীয় হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন বলে জানা গেছে।
সাবিনা ইয়াসমিন ছবি: আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় এক নেত্রী
নাটোর-নওগাঁ অঞ্চলের সংরক্ষিত নারী আসনে আলোচনায় রয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও বর্তমান কমিটির সদস্য সাবিনা ইয়াসমিন ছবি। তিনি নাটোর-২ (সদর-নলডাঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু-এর সহধর্মিণী।
২০০৮ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নাটোর-২ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হয়েছিলেন। দলীয় দুর্দিনে, বিশেষ করে দুলু কারাবন্দি থাকাকালে তিনি জেলা বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। অনুসারীদের দাবি, শিক্ষা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও মাঠের সক্রিয়তার কারণে তিনি মনোনয়ন পেলে নাটোর-নওগাঁ অঞ্চলে দলীয় কার্যক্রম ও উন্নয়ন তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
সুফিয়া হক: অভিজ্ঞতার আলোকে মূল্যায়নের প্রত্যাশা
জেলা মহিলা দলের সভাপতি ও সাবেক এমপি সুফিয়া হকও এবার মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তিনি জেলা বিএনপির প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হকের সহধর্মিণী। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে স্বল্প সময়ের জন্য এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এই নেত্রী মনে করেন, তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলীয় অবদান বিবেচনায় দল এবার তাকে মূল্যায়ন করবে।
অ্যাডভোকেট আইনুন নাহার: ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে
জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও জেলা শ্রমিক দলের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আইনুন নাহার ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ছিলেন এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দলীয় সূত্র জানায়, তার আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে পরিবারকে নানা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ১৯৯১ সালে জেলা বিএনপি তাকে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য সুপারিশ করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অনুমোদন দিলেও শেষ পর্যন্ত অজ্ঞাত কারণে তার মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়নি। এবার তিনি দলীয় মূল্যায়নের আশায় রয়েছেন।
মহুয়া নূর কচি: ত্যাগের রাজনীতির প্রতীক
বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পৌর বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ নূর বাবুর স্ত্রী মহুয়া নূর কচিও আলোচনায় আছেন। ২০১০ সালের ৮ অক্টোবর বনপাড়ায় বিএনপির কর্মসূচি চলাকালে সানাউল্লাহ নূর বাবু নিহত হন।
ঘটনার পর খালেদা জিয়া নিজে তার বাসায় গিয়ে পরিবারকে সান্ত্বনা দেন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দেন। এরপর থেকে মহুয়া নূর কচি বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন। বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, তার পরিবারের ত্যাগ ও ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততার কারণে তাকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়া উচিত।
সানজিদা ইয়াসমিন তুলি: রাজপথের তরুণ মুখ
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) এলাকার মেয়ে ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানজিদা ইয়াসমিন তুলি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আলোচিত। তিনি ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব এবং জিয়া স্মৃতি পাঠাগার কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে হামলার শিকার হন তিনি। পরবর্তীতে ২০২১ সালে প্রেস ক্লাবের সামনে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বরে সংঘর্ষে আহত হওয়ার ঘটনাও রয়েছে তার জীবনে। নাটোর-১ আসনের বিএনপি নেতাকর্মীদের একাংশ মনে করেন, তরুণ ও রাজপথ-সক্রিয় এই নেত্রীকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দিলে সংগঠনে নতুন গতি আসবে।
সিদ্ধান্ত এখন হাইকমান্ডের
নাটোরে বিএনপির রাজনীতিতে সংরক্ষিত নারী আসন ঘিরে আলোচনা যতই জোরালো হোক, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আসবে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দলীয় ভারসাম্য—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হবে।
এদিকে নাটোর বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা অপেক্ষায় রয়েছেন—এই পাঁচ নেত্রীর মধ্য থেকে কাকে শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে দেখা যাবে।
এম







































