ছবি : প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ও শতবর্ষী জব্বারের বলীখেলা আজ শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে নগরের লালদীঘি মাঠে। আগামীকাল শনিবার অনুষ্ঠিত হবে মূল বলীখেলা। ১৯০৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের চেতনা থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন এবার ১১৭ বছরে পদার্পণ করেছে।
জানা যায়, বদরপাতি এলাকার সওদাগর আবদুল জব্বার তরুণদের শারীরিকভাবে সক্ষম ও আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে এ বলীখেলার প্রচলন করেন। সময়ের পরিক্রমায় এটি শুধু একটি মল্লযুদ্ধ নয়, বরং চট্টগ্রামের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও গণমানুষের প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
এই বলীখেলা ঘিরে লালদীঘিসহ বিভিন্ন এলাকায় উৎসবের আমেজ দেখা গেছে। বলীখেলার পাশাপাশি বসেছে গ্রামীণ মেলা। মেলায় হাজারো মানুষ তাদের পছন্দের জিনিসপত্র কিনছেন।
মেলায় ঘুরতে আসা নগরের এক বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিবছরই এই বলীখেলা দেখতে আসি। এটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। পরিবারের সবাইকে নিয়ে এলে অন্যরকম আনন্দ লাগে।”
একইভাবে মেলায় আসা গৃহিণী নাসরিন আক্তার বলেন, “শুধু খেলা নয়, মেলাটাও আমাদের জন্য বড় আকর্ষণ। বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে ভালো লাগে, কেনাকাটাও করা যায়।”
বলীখেলা মূলত গ্রামীণ নিয়মে পরিচালিত একটি মল্লযুদ্ধ। আন্তর্জাতিক কুস্তির মতো নির্দিষ্ট বিধি না থাকলেও এতে রয়েছে শক্তিমত্তা প্রদর্শনের অনন্য এক ধারা। ইতিহাসবিদদের মতে, এ ধরনের ক্রীড়া একসময় শোষণবিরোধী চেতনা জাগ্রত করত এবং সমাজকে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করত।
বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় গঠিত ‘অনুশীলন সমিতি’র সদস্যদের লাঠিখেলা, কুস্তি, মুষ্টিযুদ্ধসহ বিভিন্ন শারীরিক কৌশলে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এসব ক্রীড়া ছিল আত্মরক্ষা ও সংগ্রামের প্রস্তুতির অংশ।
অন্যদিকে, ‘হাজার বছরের চট্টগ্রাম’ সংকলনে বলা হয়, মুসলিম শাসনামল থেকেই চট্টগ্রামে বলীখেলার প্রচলন রয়েছে। সে সময় বিত্তবানরা কুস্তিগীরদের লালন-পালন করতেন, যাতে তারা বিপদে-আপদে শক্তি প্রদর্শন করতে পারে। বিভিন্ন উৎসবেও জনসমক্ষে এসব মল্লযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হতো।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, একসময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে খোলা মাঠে বলীখেলার আয়োজন করা হতো। ঢোলের তালে তালে পালোয়ানদের লড়াই দেখতে ভিড় জমাতো হাজারো মানুষ। কোথাও কোথাও এর সঙ্গে যুক্ত হতো ষাঁড়ের লড়াইও।
যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক জায়গায় বলীখেলার প্রচলন কমে গেছে, তবুও লালদীঘি মাঠের জব্বারের বলীখেলা এখনও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। আবদুল হক চৌধুরীর ‘চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, চট্টগ্রামে একসময় দুই মাসজুড়ে বলীখেলার আয়োজন হতো, যা অন্য কোথাও দেখা যেত না।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৯১৫ সালে অনুষ্ঠিত বলীখেলাকে ঘিরে লালদীঘি এলাকায় ছিল ব্যাপক জনসমাগম। মাসিক ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত বর্ণনায় বলা হয়, খেলা শুরুর আগে থেকেই জনতার ভিড়ে রাস্তা প্রায় বন্ধ হয়ে যেত। মল্লরা বাদ্যের তালে তালে নৃত্য করে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন এবং প্রতিপক্ষকে ‘চিৎপটকন’ দিতে পারলেই জয় নিশ্চিত হতো।
এদিকে মেলা ও বলীখেলাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। মাঠ ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা।
দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, “দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি পোশাকধারী সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নজরদারি রয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।”
পিএস







































