ফাইল ছবি
ঢাকা: ‘২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে বিতর্কিত কার্যক্রমের অভিযোগে পরিবর্তন আনা হয়েছিল বাংলাদেশ পুলিশের পোশাকে। গত বছরের নভেম্বরে ১৪১ কোটি টাকার কার্যাদেশের মাধ্যমে গাঢ় নীল রং পরিবর্তন করে পুলিশের জন্য আয়রন গ্রে রঙের নতুন পোশাক নির্ধারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে পরিবর্তিত এই পোশাকের রং নিয়ে শুরু থেকেই চাপা ক্ষোভ ছিল বাহিনী সদস্যদের মধ্যে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে কনস্টেবল পর্যায়ের সদস্যদের কাছ থেকেও অভিযোগ আসে নতুন পোশাকের রং ও মান নিয়ে। যা নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে খোদ পুলিশ সার্ভিস এসোসিয়েশনও। লিখিত জরিপ নেয়া হয়েছে বাহিনীর প্রতিটি সদস্যদের কাছ থেকে। এই মতামতের ভিত্তিতে আবারো পরিবর্তন আনা হচ্ছে পুলিশের পোশাকে। সব ঠিক থাকলে আগের নীল ও মেট্রোপলিটন এলাকায় হালকা সবুজ রংয়ের পোশাকেই সাধারণ মানুষের মাঝে দেখা যাবে পুলিশকে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, গত সপ্তাহের সোম ও মঙ্গলবার দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে কল্যাণ প্যারেড হয়। ২ লাখ ১২ হাজার পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সেখানে অংশ নেয়া পুলিশ সদর দপ্তর ও রেঞ্জ পুলিশ সদস্য মিলে মোট ১ লাখ ৮ হাজার ৬৪১ জন পুলিশ সদস্যদের কাছে লিখিত ফরমে পোশাক নিয়ে হ্যাঁ/না মতামত চাওয়া হয়। সেসব ফরমের মতামত যোগ করে দেখা যায় ৯৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ পুলিশ সদস্য আগের পোশাক নেভি ব্লু শার্ট-প্যান্ট এবং মহানগর এলাকায় সবুজ (গ্রিন) শার্ট ও গাঢ় প্যান্টের পক্ষে রায় দেন। মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৯১৩ জন পুলিশ সদস্য আগের পোশাকের পক্ষে মত দিয়েছেন। আর ২ হাজার ৮১৭ জন পুলিশ সদস্য অন্য রংয়ের পোশাক চান। যা শতকরা হিসাবে ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর বর্তমানের আয়রন গ্রে রংয়ের শার্ট ও কফি রংয়ের প্যান্ট পরতে চান ৯১১ জন সদস্য।
আয়রন গ্রে পোশাক পরে রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় দায়িত্বরত এক ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, নতুন পোশাকের কাপড় আগের পোশাকের চেয়ে শক্ত। দীর্ঘ সময় গায়ে রাখা যায় না। কষ্ট হয়। কাপড়ের মানও ভালো না। কয়েকদিনেই ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কি করবো। আমরা তো এ বিষয়ে কাউকে কোনো অভিযোগ করতে পারি না। সরকার আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছে তাই পরতে হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু আমি না আমার মতো সকলের মনেই এই পোশাক নিয়ে ক্ষোভ আছে।
এদিকে পোশাক নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরও আলাদাভাবে বিশেষ বৈঠক করেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আগের পোশাকে ফিরে যেতে সরকারের হাইকমান্ড থেকে মৌখিকভাবে নির্দেশনা এসেছে। বর্তমানে পুলিশ যে ধরনের পোশাক ব্যবহার করছে সেটি দেখলে মনে হচ্ছে বাসা অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানের সিকিউরিটি গার্ড। এ নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যায় থেকেও অভিযোগ দিয়ে আসছে। তাছাড়া এই পোশাকের সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পোশাকেরও অনেকটাই মিল রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার অনেকটা জোর করেই রুচিহীন রং ও নিম্নমানের কাপড়ে তৈরি পোশাক পুলিশকে ব্যবহার করতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, পোশাক পরিবর্তনের জন্য গত সরকারের সাবেক দু’জন প্রভাবশালী উপদেষ্টা ও সাবেক একজন পুলিশ কর্মকর্তা (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন) বেশি হস্তক্ষেপ করেছেন। তাছাড়া পুলিশের অন্তত এক ডজন কর্মকর্তা পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছেন। তাদের মধ্য চারজন অবসরে চলে গেছেন। তারাই মূলত ঘুরেফিরে সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকেন। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে বিষয়টি আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে অবহিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই এসব নতুন সরকারের দায়িত্বশীলদের নজরে এসেছে। তারাও পুলিশের নতুন ইউনিফর্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে আবার পুরনো ইউনিফর্মে ফিরে যাওয়ার কাজ শুরু করেছে। আশা করছি সব ভালো হবে।
এদিকে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস এসোসিয়েশন বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ পুলিশের জন্য যে নতুন পোশাক নির্বাচন করেছে, সেখানে পুলিশ সদস্যদের গায়ের রং, আবহাওয়া এবং সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো প্রকার জনমত যাচাই ছাড়াই নির্বাচিত এই পোশাকের সঙ্গে ইউনিফর্মধারী অন্যান্য সংস্থার পোশাকের হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মতামত উঠে এসেছে। বিষয়টি এসোসিয়েশনের নজরে এসেছে এবং বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য তড়িঘড়ি করে নেয়া এই পরিবর্তনের পক্ষে নন। বরং তারা আগের পরিহিত পোশাকটিকে বাংলাদেশ পুলিশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের প্রতীক হিসেবে মনে করেন।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, বর্তমান পোশাক নিয়ে শুরু থেকে আমাদের অস্বস্তি ছিল। পুলিশ সদস্যদের মতামতকে আমলে নেয়া হয়নি। অনেকে এই পোশাক পরতে চান না। মাঠপর্যায়ে নতুন পোশাকটি উপযোগী নয়। এই পোশাক অনেকটা বেসরকারি সিকিউরিটি গার্ডের পোশাকের সঙ্গে মিল রয়েছে, যা পুলিশের নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তিনি বলেন, আগের পোশাকে ফেরত গেলে সরকারের বড় আর্থিক ক্ষতি হবে না। কারণ নির্দিষ্ট সময় পরপর পুলিশ সদস্যদের নতুন পোশাক দেয়া হয়। ওই সময় থেকে আগের পোশাকে ফেরত যেতে পারি। এতে তেমন কোনো অসুবিধা হবে না।
পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীও। তিনিও বলেন, পুলিশের নতুন পোশাক পরিবর্তন করা হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশের ভূমিকা অগ্রগণ্য। তবে বর্তমান পোশাকে পুলিশ বাহিনী সন্তুষ্ট নয়। সুতরাং বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী যেন আগের ঐতিহ্যমণ্ডিত কোনো একটি পোশাক ফিরে পায়, সে বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহলে আলোচনা করে দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। স্বাধীন ও শক্তিশালী পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠনে কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এসআই







































